তিব্বতের দিনগুলো ॥ মোহাম্মদ তৌহিদ


তিব্বতের দিনগুলো (পর্ব-১): তিব্বত নামটির সঙ্গে যেন মিশে আছে কোনো রহস্য। বিশেষ করে, প্রাচীনকাল থেকেই বাংলার মানুষ যেন তিব্বত সম্পর্কে অদ্ভুত ধারণা পোষণ করে আসছে। কেউ বলেতেন, তিব্বত হলো জাদুর দেশ, যেখানে গেলে কেউ আর ফিরে আসে না।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত এ অঞ্চলটি হিমালয় পর্বতমালার আড়ালে ছিল দীর্ঘদিন দুর্গম পার্বত্য পথ। রহস্যাবৃত সুউচ্চ অঞ্চল ও বিভিন্ন কঠোরতার কারণে কাছাকাছি থেকেও তিব্বত যেন খুব ‌দূরের দেশ হয়ে থেকেছে আমাদের কাছে।

তবে, যুগ বদলে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে তিব্বত এখন আর অধরা কোনো রহস্য নয়। ‘পৃথিবীর ছাদ’ হিসেবে পরিচিত তিব্বত এখন চীন ও বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত পার হয়ে ভারত ও হিমালয় পর্বতের ঠিক ওপারেই তিব্বত। এর রাজধানী লাসা। দুই দশক আগেও তিব্বতে যাতায়াত করতে হতো দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে। কিন্তু সময় বদলেছে। তিব্বত এখন আর ততটা দুর্গম নয়, যতটা দুর্গম রয়েছে মানুষের কল্পনায়। তিব্বতের প্রতিবেশী তিনটি রাষ্ট্র রয়েছে- নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমার। এ দুই অঞ্চলের পর্যটকরা, বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সারা বছরই তিব্বত যাওয়া-আসা করছেন।

যাত্রা শুরু
জুনের প্রথম সপ্তাহ- ভরা গ্রীষ্মকালে বেইজিং থেকে আমার যাত্রা শুরু হয়। বেইজিং থেকে বিশেষ বিমানযোগে সরাসরি চার ঘণ্টা উড্ডয়ন করে তিব্বতের লিনচ্রি জেলার নিংছ্রি শহরের বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিশেষ বিমান। সাধারণত যাত্রীবাহী বিমান বেইজিং থেকে সরাসরি লিনচ্রি যায় না। তবে, বিশেষ বিমান বলে কথা!

দিনটি ছিল সুন্দর। রৌদ্রদীপ্ত। অবশ্য বিমান থেকে মেঘমালার ওপরে পরিবেশ সবসময় এমনই হয়—তা বিমান ভ্রমণকারীরা জানেন। রহস্যে ঘেরা তিব্বতের প্রথম বিস্ময়টা মূলত এই আকাশ থেকেই শুরু হয়। সাধারণত, আকাশের ওপর থেকে মেঘ ও বাতাসের স্তর ভেদ করে কিছুটা ঝাঁকুনি সহ্য করে তবেই রানওয়েত নামে বিমান। কিন্তু, এ অঞ্চলে যেন তার ব্যতিক্রম দেখলাম। উজ্জ্বল আকাশে মেঘের ওপর থেকে শুধু মেঘই দেখা যাচ্ছে না, বরং মেঘ ফুঁড়ে জেগে ওঠা অসংখ্য পার্বত্য চূড়া দেখা যাচ্ছিল।

“সে কী! ধাক্কা লেগে যাবে তো!”
আমার মতো যারা প্রথম এখানে এলো, সবাই যেন এমনটাই আশঙ্কা করছিল।খানিকটা বিস্ময় নিয়ে ভালোমতো খেয়াল করে দেখা গেল, আকাশের বুকে শুধু মেঘ নয়, অসংখ্য পাহাড়-পর্বতের চূড়া যেন ছুঁতে চাচ্ছে আমাদের বিমানটিকে। আকাশের যে স্থানে শুধু মেঘ থাকার কথা ছিল, এখানে তার সঙ্গে যোগ দিয়েছে পর্বতমালার অনেকগুলো চূড়া! তবে তা রূক্ষ-শুষ্ক নয়; যতদূর চোখ যায় বেশিরভাগই সবুজের চাদরে ঢাকা। এত উঁচু থেকে বিমানের মোটা কাঁচ ভেদ করে স্পষ্ট দেখা যায়। এক জাতীয় ঝাউ গাছ বলেই মনে হলো।

চোখের জ্যোতি বেড়ে গেল নাকি!
আসলে ঠিক তা নয়। ভূ-পৃষ্ঠের এতটা উঁচুতে আকাশের সীমানায় দূষণ নেই বললেই চলে। সবকিছু এত ঝকঝকে যে বহুদূর পর্যন্ত খালি চোখে দেখা যায় খুব সহজেই।

আকাশের সীমানায় এত গাছ লাগালো কে, কখন এবং কীভাবে- এ প্রশ্ন মাথায় নিয়েই বিস্মিত হয়ে চারদিকে চোখ রাখলাম। দেখলাম কঠিন পর্বত, গাছের সারি ও মেঘের সীমানা ভেদ করে এগিয়ে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটি। তিব্বত সরকার পর্বতাঞ্চলের এ-মাথা ও-মাথা, সবখানেই যেন বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। বলাই বাহুল্য আমরা তখনও মাঝ আকাশে রয়েছি এবং সেখান থেকেই মেঘের সীমানায় এসব দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। একেবারেই যেন অবিশ্বাস্য লাগছিল। আকাশের মধ্যে পাহাড়-পর্বত, গাছ-গাছালি বিদ্যুতের লাইন—আধা ঘণ্টা এমন ঘোরেই কেটে গেল যাত্রীদের। অবশেষে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আকাশের মধ্যেই পর্বতাঞ্চলের খানিকটা সমতলে তৈরি করা বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিশেষ বিমানটি। হ্যাঁ, তখনও আমরা আকাশে। কারণ, চারদিকে মেঘের চলাচল দেখা যাচ্ছে। বিমান থেকে নামার পর দেখা গেল—ঘটনা সত্যি। বিমানবন্দরের বিমান ও মেঘ প্রায় এক সারিতে চলাচল করছে। লাফ দিলেই যেন মেঘ ধরা যায়- এমনই এক অবস্থা। তবে, কী মেঘ নেমে এলো ধূলির ধরায়? আসলে তা নয়।

বিমান অবতরণ করেছে তিব্বতের লিনচ্রি জেলার নিংছ্রি মিল্লিং এয়ারপোর্টে। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৯৮৪ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। আকাশের যেখানে মেঘমালার ঘর- বিমানবন্দরটি অনেকটা সেখানেই তৈরি। আসলে গোটা জেলায় আকাশের সীমানায় গড়ে উঠেছে। লিনচ্রিতে অবস্থানের দিনগুলোতে ঘুরে ফিরেই এ দৃশ্য বার বার চোখে পড়েছে। সমুদ্রতীরের দেশ বা ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছে এ একেবারেই অস্বাভাবিক। সারাজীবন যে অধরা মেঘ মাথার ওপরে ছায়া দিয়ে বেড়িয়েছে, তা হঠাৎ করেই যেন পাশে এসে কাঁধে হাত রেখে বলছে, “বন্ধু! কী খবর বল!”

হ্যাঁ, তিব্বতের অবতরণের পরই মেঘের সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়েছিলাম, মেঘের সৌন্দর্য, পাহাড়-পর্বতে তার উচ্ছল লুকোচুরি দেখে মেঘের প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম। যারা আকাশের সৌন্দর্য দেখতে পছন্দ করেন, মাথার ওপর বিশাল-উদার নীল আকাশ আর সাদা মেঘের মাতামাতি দেখতে ভালোবাসেন, তিব্বত হতে পারে তাদের অন্যতম আকর্ষণীয় অঞ্চল। কারণ, তিব্বত মালভূমি থেকে আকাশকে যতটা কাছে দেখা যায়, অন্য কোনো স্থান থেকে তা সম্ভব না! (চলবে)