ফুলের দেশ জাপান ॥ প্রবীর বিকাশ সরকার


জাপানে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বসন্তকালই ধরা হয়ে থাকে। তবে ঠান্ডা থাকে যথেষ্ট। ক্রমশ জলবায়ু উষ্ণ হয়ে উঠতে থাকে নিচের দিক থেকে অর্থাৎ দক্ষিণ অঞ্চল থেকে।

বসন্তকালে জাপান অমরাবতী হয়ে ওঠে। এই সময় সর্বত্র নানা আকৃতি ও বর্ণের ফুলের সমারোহে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। বিশেষ করে, উমে এবং সাকুরা প্রধান ফুল।

জাপান শিশু আর ফুলের দেশ। ফলে এই সময়টা জাপানের সবচেয়ে আলোকিত ও উদীপ্ত ঋতু হিসেবে বিবেচিত।

জাপানের বসন্তকাল বিশ্বে খ্যাতি লাভ করেছে মূলত ‘সাকুরা’ ফুলের জন্য। সাকুরার সৌন্দর্য অতুলনীয়। ‘সাকুরা’ সৌন্দর্যের অধিকারী হলেও তার একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছে। সে ‘উমে’ ফুল। কোনো কোনো উমে এবং সর্বপ্রকার সাকুরা গোলাপাকৃতির হয়ে থাকে। সাকুরার মতোই ছোট্ট উমে ফুলেরও রয়েছে বিশেষ জনপ্রিয়তা সুদূর অতীতকাল থেকে।

গন্ধহীন সাকুরার মতোই ‘উমে’ সুন্দর তবে গন্ধযুক্ত। গাঢ়, হালকা গোলাপি এবং সাদা রঙের উমে ফুলই বেশি দেখা যায়। উমে ফুল সাকুরা ফোটার কিছু আগে থেকে ফোটা শুরু করে এপ্রিলের প্রথম ভাগ পর্যন্ত থাকে। প্রকার ভেদে ‘উমে’ ফুলের আকার-আকৃতি বিভিন্ন রকম।

জলবায়ু যখন উষ্ণ হয়ে ওঠে তখন সেও ‘সাকুরা’র মতোই পাপড়ি মেলে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিউশুউ, কাগোশিমা, ওকিনাওয়া দ্বীপে সর্বাগ্রে ফোটে। কেননা উষ্ণ হাওয়া সেদিক থেকেই বইতে শুরু করে বলে।

আসলে দুটো ফুলই তুলনারহিত। ‘উমে’কে ইংরেজিতে বলে জাপানিজ অ্যাপ্রিকট বা জাপানি পাম (Japanese Apricot /Japanese Plum)। বৈজ্ঞানিক নাম Prunus mume। উমে এসেছে মূলত চীন দেশ থেকে ইয়ায়োই যুগে (খ্রি:প‚: ৩০০-খ্রি:৩০০)। চীনের জাতীয় ফুল হচ্ছে উমে।

জাপানে প্রায় ৪০০ প্রকারের সাকুরা এবং ৫০০ প্রকারের ‘উমে’ বৃক্ষ রয়েছে বলে জানা গেছে। কোনো কোনো উমে বৃক্ষ শুধু ফুলের জন্য রোপন করা হয়। আবার কোনো কোনো উমে বৃক্ষ ফলের জন্য যাকে বলে ‘উমেবোশি’।

এও জানা যায়, উমে ফুলবৃক্ষ থেকেও ফল পাওয়া যায়। জাপানি সমাজে ‘উমেফল’ তথা ‘উমেবোশি’র কোনো তুলনা নেই। ‘উমেবোশি’ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী একটি প্রাকৃতিক ওষুধ। তবে এটা ব্যাপক মাত্রায় ব্যবহৃত হয় খাবারে। প্রতিদিনই উমে খাওয়া হয় ওনিগিরি বা রাইস বলের সঙ্গে। ‘উমেশুউ’ বা উমে ফল থেকে প্রস্তুত মদ প্রাপ্ত বয়স্ক নরনারী এবং তরুণীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। সম্ভবত উমের ব্যবহারিক গুণে তার ফুলও অতীতকালে অত্যধিক সমাদৃত হয়েছিল।

অবশ্য ‘সাকুরা’ও সমাদৃত ছিল কিন্তু জনপ্রিয় ছিল না। আর সে তথ্যটা জানতে পারা যায় প্রাচীন জাপানি সাহিত্য থেকে। যেমন ‘মানয়োওশুউ’ নামক জাপানের সবচেয়ে প্রাচীন একটি সাহিত্য সংকলন। তাতে দশ হাজার গীতি-কবিতা গ্রন্থিত কয়েক খণ্ডে বিভক্ত। এর মূল রচনাকাল, সম্পাদক যাঁরা সম্পাদনা করেছেন তাঁদের মধ্যে প্রথম দিককার তারিখ যা পাওয়া গেছে তা ৭৪৯-৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ। এই সংকলনে সাকুরার চেয়ে ‘উমে’ ফুলের প্রশংসা নিয়ে লেখা হয়েছে অধিক সংখ্যক গান। কেন এত প্রশংসা করা হয়েছে উমে সম্পর্কে এর কারণ সৌন্দর্য ছাড়া আরও একটি আছে।

উমে ফুল সহজে ঝরে পড়ে না, ডালের নরোম ডগাতেও সে টিকে থাকার মতন শক্তিশালী। যা কিনা প্রাচীন কবিরা বীরযোদ্ধাদের পৌরুষত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

পক্ষান্তরে, ‘সাকুরা’ যেন আসলেই নারীর মতো কোমল এবং ভঙ্গুর। কিন্তু সব কবি বা মানুষ সবসময় পৌরুষত্বকেই সমর্থন করবেন তা নয়। নারীর যৌবনকে বহু কবি, পণ্ডিত, শিল্পী বিভিন্ন রূপে দেখেছেন। অনুরূপ, বাতাসে ‘সাকুরা’র পাপড়ি ঘুরে ঘুরে ঝরে পড়ার দৃশ্যের সঙ্গে সাহসী যোদ্ধার মৃত্যুপতনের চিত্রময়তার তুলনা করা হয়েছে মধ্যযুগে।

জাপানে একটি প্রবচন আছে ‘হানা বিয়োরি’ নামে, যার অর্থ ফুলদেখার দিন। যেদিন স্বচ্ছ নীল আকাশ, পরিবেশ রোদালো উজ্জ্বল সেদিন প্রস্ফুটিত উমে ফুল বা সাকুরা ফুল দর্শন করে আনন্দ উপভোগকে ভিত্তি করে একটি রীতি গড়ে উঠেছে প্রাচীনকালে। যাকে ‘হানামি’ নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। বরং ‘হানা বিয়োরি’র চেয়ে ‘হানামি’ বহুল পরিচিত শব্দ এবং রীতি।

জাপানজুড়ে রয়েছে শত শত পরিকল্পিত উমে ফুল ও সাকুরা ফুলের বাগান বিভিন্ন স্থানে। জাপানিরা ‘হানা বিয়োরি’র দিন ‘হানামি’ উপভোগ করতে দলবেঁধে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। হাইজিন বা হাইকু কবিরা ফুল দেখে নোট খাতায় হাইকু লিখে রাখেন। ফুল নিয়ে এমন মাতামাতির সংস্কৃতি বিশ্বের আর কোনো জাতির মধ্যে আছে কিনা আমার জানা নেই।