কাজী রাফির ছোটগল্পগুলো এত বৈচিত্র্যপূর্ণ, অনুভব-সমৃদ্ধ, বুঁননের নিখুঁত নিপুণতায় সংকেতবহ যে, গল্পগ্রন্থের সব গল্প সম্পর্কে এক ফ্ল্যাপে কিছু বলা সম্ভব নয়।
পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলো সম্পাদনার প্রয়োজনে গল্পগুলো বার বার পাঠ করতে গিয়ে গল্পকারের কল্পনার আভিজাত্য, চরিত্রগুলোর মনস্তাপের সঙ্গে জীবনের আর্তি, গল্প-গাঁথুনির অভিনবত্ব, ভাষার শক্তি–সবকিছু মিলে যে কতবার তাঁকে পাঠ করেছি, ততবারই অভিনবত্ব খুঁজে পেয়েছি। গল্পগুলো আমার কল্পনা এবং ভাবনার দ্বারকে উন্মুক্ত করেছে।
‘ওয়ান নাইট কস্টস অনলি এইট থাইজেন্ড, স্যার। বাট আই অ্যাসিওর ইউ ইনজয় মোর দ্যান ইয়োর মানি।’ ‘বৃষ্টিরাতের অভিসারিণী’ গল্পের শুরুতে সুইস লাস্যময়ী তরুণী এমার এমন বাক্যে আমরা হোঁচট খাই। ইউরোপীয় নারী হলেও গল্পের এই চরিত্রকে ঢাকার অভিজাতপাড়ার কিছুটা নির্জন গলিতে আমরা আবিষ্কার করি। সুপ্রতিষ্ঠিত, সুদর্শন একজন তরুণকে সে তার সঙ্গে রাত কাটানোর জন্য বিনিময় মূল্য প্রস্তাব করছে। গল্পটা এভাবে শুরুর পর সেই নারী তরুণের সঙ্গে জুরিখের লেকের পাশে এক রাত কাটানোর স্মৃতির অবতাড়না করে।
কিন্তু আমরা আশ্চর্য হই লেখকের গল্প বলার ঢঙে। তরুণটি জুরিখে সেই নারীর স্মৃতি মনে না করতে পারলেও মনে পড়ে তার গ্রামে একলা মাঠে এক প্রবল বৃষ্টির প্রলম্বিত ক্ষণকে। সেই প্রান্তর আঁধার করা বিকেলে সে উদ্ভিন্না যৌবনা এমাকে একান্ত করে পেয়েছিল। কিন্তু তরুণের সাথে শারিরী ব্যাপারগুলো চেনা হলেও এমার কাছে সেই সময় এবং স্থানগুলো অচেনা। এমারা যে আসলেই প্রতিটি কামনাতাড়িত নিঃসঙ্গ পুরুষের ভিতরে বাস করা কল্পনাসুন্দরী – গল্প শেষের দিকে তা উপলব্ধি করলেও পাঠক আবার চমকে ওঠেন গল্পের সেই একই শেষ বাক্যে- ‘ওয়ান নাইট কস্টস অনলি এইট থাইজেন্ড, স্যার। বাট আই অ্যাসিওর ইউ ইনজয় মোর দ্যান ইয়োর মানি।’
এই শেষ বাক্য আবার পুরো গল্পকে পুনরাবর্তে ঘুরিয়ে দেয়। গল্পকার সুইস তরুণীর চরিত্র আঁকলেও ঢাকায় একাকী বাস করা কোনো তরুণীর জীবন সংগ্রামে তার সৌন্দর্যকে, দেহকে ব্যবহারের সংকেত কি আমরা পাই? গল্পকার কী মুন্সিয়ানায় জীবনের উচ্চাকাঙ্খা পূরণে একজন তরুণীর জীবনার্তিকে তুলে আনেন যে, আমরা এই তরুণীদের প্রতি আর ঘৃণা পোষণ করতে পারি না। বরং আমাদের চোখের কোণটুকু ভিজে ওঠে অন্য কোনো অনুভবে। যৌনতা এবং ভালোবাসা একাকী পুরুষের জীবন রহস্যের কুহেলিকায় কী এক অদ্ভুত মায়া হয়ে যায়। এখানেই কাজী রাফির গল্পের মহাত্ম, শক্তি এবং শিল্প।
বাংলাদেশ এবং ভারতের ‘তরুণদের একাত্তর গল্প’ সংকলনে ‘এক রাতের বিনিময়ে’ গল্পটি নিয়ে সেলিনা হোসেন সম্পাদকীয় মূল্যায়নে লিখেছেন- ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরি – কবি গান লিখেছেন হরিণ সমাজের দুঃখ নিয়ে, হোক তা হাজার বছর আগে। আজও সমাজ জীবনে ব্যঘ্রগোষ্ঠীর প্রতিপত্তিতে নীরিহ সভ্য মানুষেরা জীবন-মরণের অধিক অপমানের শিকার হতে বাধ্য হয় –তারই সাহিত্যদলিল এক রাতের বিনিময়ে গল্পটি। … কাজী রাফির উপন্যাসোচিত ছোটগল্পের বিস্তারে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কালপর্বটি প্রতিবিম্বিত। এক রাতের বিনিময়ে বর্তমান সমাজের মিরর।(সংক্ষেপিত)’
আমিও মনে করি, এই গল্পগুলো পাঠান্তে পাঠকও কাজী রাফির ছোটগল্পের শক্তি এবং শিল্পসত্তা নিয়ে নিশ্চিত হবেন।
কাজী রাফি তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র জন্য পেয়েছেন ‘এইচএসবিসি কালি ও কলম পুরস্কার- ২০১০’ এবং ‘এমএস ক্রিয়েশন সম্মাননা-২০১০’। উপন্যাস এবং ছোটগল্পে অসামান্য অবদানের জন্য পেয়েছেন ‘নির্ণয় স্বর্ণপদক-২০১৩’ এবং ‘এমএস রাহী পদক ২০১৯’।
[ লেখাটি কাজী রাফির ফেসবুক থেকে নেওয়া। বানান রীতি লেখকের ]