নৈঃশব্দ্যের সংলাপ ॥ এমদাদ রহমান


ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা ও লুইস বাগারিয়া গভীর আলাপে মগ্ন, পরে যে-আলাপটি মাদ্রিদের খবরের কাগজে ছাপা হবে; বাগারিয়া ছিলেন স্পেনের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ, বিদ্রুপাত্মক অনুচিত্রী, বিভিন্ন প্রাণিকে ব্যঙ্গচিত্রে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করতেন; এবং কবির ঘনিষ্ট বন্ধুদের অন্যতম ছিলেন তিনি; কবি গারসিয়া লোরকা বন্ধুকে বলছেন – ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারণাটি অত্যন্ত বাজে, অনেকটাই হিংস্র আর নিষ্ঠুর ব্যাপার, সৌভাগ্যক্রমে, বিষয়টা যদি স্থূল না হয়। কোনোভাবেই একজন প্রকৃত মানুষের পক্ষে ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারণায় বিশ্বাসী হওয়া সম্ভব নয়।

আজকের দিনের নাটকীয় সব মুহূর্তে, শিল্পীকে অবশ্যই তাঁর সময়ের মানুষদের জন্য হাসতে হবে, এবং কাঁদতে হবে। শিল্পীকে অবশ্যই পদ্মফুলের গুচ্ছের পাশে বসে পড়তে হবে, তাঁর কটিদেশকে কাদামাটির ভেতর ডুবিয়ে দিতে হবে, একই সঙ্গে তাঁর একটি হাতকে তাদের দিকে এগিয়ে দিতে হবে, যারা হন্যে হয়ে পদ্মফুল খুঁজে মরছে। আমার ক্ষেত্রে হয় কী, আমি সব সময়ই অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মরিয়া হয়ে থাকি। আর এ কারণেই আমি থিয়েটারের দরজায় কড়া নাড়ি, আমার সমস্ত সংবেদনকে থিয়েটারে ব্যবহারের জন্য একত্র করি।’

বাগারিয়া বলছেন, তুমি তো আমাকে জানই যে আমি হাতে অগুনতি কলম আর অল্পকিছু বিশ্বাস নিয়ে দিনে দিনে বন্য, আদিম, নৃশংস হয়ে উঠছি। আমার ভেতরের অসভ্যতা, নির্মমতা, আমার কাজকে যন্ত্রণাময় করে তোলে। এখানে শুধু একটু ভেবে দেখো, কবি, জীবনের ট্র্যাজিক প্রশ্নগুলোর উত্তর যেন একটিমাত্র কথাতেই, বহুদিন আগে আমার বাবা-মা বারবার, থেমে থেমে, ভেঙে ভেঙে উচ্চারণ করেছিলেন। লাইনটি এ-রকম :
‘আর মানুষের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল
সে জন্ম নিয়েছে…
দুষ্প্রাপ্য, মূল্যবান সম্পূর্ণ আলাপচারিতাটি পড়ুন, সদ্য প্রকাশিত বই- নৈঃশব্দ্যের সংলাপে।

‘নৈঃশব্দ্যের সংলাপ’, বইটি মূলত Art Of Fiction, বিশ্ববরেণ্য লেখকদের লিখনশৈলীর অন্তরঙ্গ উন্মোচন; যেখানে নোবেলজয়ী এলিস মুনরো বলছেন-প্রযুক্তির সুবিধার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়েছি বেশ দেরিতে, হ্যাঁ, কম্পিউটারে লিখি তো বটেই, কিন্তু কি-বোর্ডে যাওয়ার আগে গল্পটিকে কয়েকবার হাতে লিখেই খসড়া করে ফেলি। এভাবে কাজ করতেই আমি অভ্যস্ত। একটি গল্প লিখতে দু-মাস লাগতে পারে; গল্প ভাবনা শুরু, তারপর লিখতে থাকা। কিন্তু একটি গল্পের জন্য মাত্র দু-মাস বিরল ঘটনা, খুব সম্ভবত ছয় থেকে আট মাস লেগে যায় একটি গল্পের চূড়ান্তে পৌঁছাতে; অনেক পরিবর্তন, কাটাকাটি, ভুল পথে চলে যাওয়া তারপর গল্পের গতিপথ বদলে দেওয়া; ভাবনার কিছু হয়তো এসেছে কিছু আর খুঁজেই পাওয়া যায় না, কিছু তো চিরতরে হারিয়েই যায়, এভাবে… লেখাটি আমার জন্য যন্ত্রণাদায়ক হয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত টানা লিখতে থাকি। সকালে ঘুম ভাঙলেই লেখার কাছে ফিরে যাই, এক মগ কফিও বানিয়ে ফেলি, তারপর জীবনের নানামুখী ব্যস্ততা এসে ঝাপটে ধরার আগে পর্যন্ত কয়েক ঘণ্টা লিখে যেতে মরিয়া হয়ে উঠি।
আলবেয়ার কামু বলছেন-
পুনর্নিমাণের ক্ষমতার ভেতর থেকেই একজন লেখককে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। লেখক অনবরত নিজেকে ভাঙবেন, গড়বেন, ভাঙাগড়ার নিরন্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে যাবেন। তিনি হয়তো একই কথা লিখছেন, জগতের সমস্ত লেখকই তো একটা কথাই লেখেন, তিনিও লিখবেন, তাতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু দেখতে হবে, লেখক যখন লিখছেন, তখন তিনি তাঁর ফর্মটিকে পুনর্নির্মাণ করছেন তো? প্রতিটি লেখায় নিজেকে ভাঙছেন তো? প্রচলিত ফর্ম নিয়ে লেখকের ভেতরে শঙ্কা থাকে, তাই লেখক নিজের ছন্দকে বারবার আঘাত করবেন। প্রচলকে তিনি ভাঙবেন।লেখকদের লেখালেখির ক্র্যাফট নিয়েই এই বই- ‘নৈঃশব্দ্যের সংলাপ ।

নৈঃশব্দ্যের সংলাপ [বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার]
ভাষান্তর ও সম্পাদনা: এমদাদ রহমান
প্রকাশক: জলধি
প্রচ্ছদ: তাইফ আদনান
প্রকাশকাল: বাংলাদেশ সংস্করণ জানুয়ারি ২০২১
দাম: ৬০০ টাকা