তিব্বতের দিনগুলো (পর্ব-২) ॥ মোহাম্মদ তৌহিদ


বিমানবন্দরে তিব্বতীয় আপ্যায়ন: বিমান থেকে নামার পরই বিস্ময়মাখা আনন্দ বিরাজ করে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের চোখে মুখে। দারুণ এক রহস্যপুরী জয়ের আনন্দে অনেকেই অভিভূত। বিমানবন্দরেই তিব্বতি আতিথেয়তার দেখা পাওয়া যায়। ঐতিহ্যবাহী স্থানীয় পোশাক পরা তিব্বতিরা দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান।

তাদের গলায় দীর্ঘ সাদা কাপড় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীদের হাতের পাত্রের দিকে দৃষ্টি আটকে যায়। বর্ণিল পোশাকধারী কারও হাতে গম, কারও হাতে বার্লি, কারও হাতে স্থানীয় পাই চিও বা মদ ভর্তি পাত্র। অতিথিরা বিভিন্ন পাত্রে রাখা বিভিন্ন উপকরণ আঙ্গুল ডুবিয়ে নেন এবং আকাশের দিকে তিনবার ছিটিয়ে দেন। এতে স্বর্গ ও পৃথিবীর জীবনে কল্যাণ হবে বলে বিশ্বাস করে স্থানীয়রা। বিদেশিরা তাতে কোনো বিশ্বাস না করলেও স্থানীয়দের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সে রীতি পালন করেন। অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছবি তুলতে। বাস্তব অবস্থা এমন যে, বিমানবন্দরের যে দিকেই চোখ যায় সেদিকেই যেন ছবির মতো সুন্দর।

বিমান থেকে নামতেই যেন ‘আকাশের’ সঙ্গে দেখা। কেন বলছি এ-কথা? কারণ আমরা তো আকাশের বুকে যে বিমানবন্দর- সেখানেই নেমেছি। এ বিমানবন্দরটি জেলার সবচেয়ে উঁচু স্থানে অবস্থিত। প্রায় ৩০০০ মিটার। মাথার বেশ কাছাকাছি মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। সাদা-সাদা পেঁজো তুলোর মতো মেঘে। চোখের এত কাছে উড়ে বেড়াচ্ছে যা অবিশ্বাস ছবির মতো মনে হয়। কিন্তু তাই সত্য, সুন্দর ও বাস্তব। অতিথিরা যে যার ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন দারুণ প্রাকৃতিক দৃশ্য ধারণে। জগতের খুব বেশি স্থানে নিশ্চয়ই এমন সৌন্দর্যের দেখা পাওয়া যায় না।

বিমানবন্দরের তিন দিকই সবুজ পর্বত বেস্টিত। তাতে বিছিয়ে রয়েছে উপর থেকে দেখা সেই সারি সারি গাছ। আর তারই মধ্য দিয়ে পাহাড়-পর্বত-মেঘ ফুঁড়ে চলে গেছে বিদ্যুতের তার। আর লম্বা লম্বা টাওয়ার।

তিব্বতবাসীরা বেশ আগেই বৈদ্যুতিক সংকট থেকে মুক্তি পেয়েছে। রাজধানী বেইজিং থেকে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে ও আকাশের এত উপরে বিদ্যুতের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে হলো না।

তিব্বতের গোটা সময় দেখেছি, দিনের বেলা সাধারণত তিব্বতের কোথাও আলোর ঘাটতি থাকে না। মাথার ওপর নীল আকাশ একটু বেশি পরিমাণ স্বচ্ছ, মেঘের ওপর ঠিক্‌রে পরা সূর্যের আলোকচ্ছটা—সবকিছুকে যেন একটু বেশিই রাঙিয়ে তুলেছে। আলো ও তার তেজ যেন একটু বেশি! বেশিক্ষণ চোখ খোলা রাখা অথবা রোদচশমা না পরে থাকাটা কষ্টকর বলেই মনে হলো। রোদের তীব্রতা যতটা-না গায়ে লাগে, তার চেয়ে ঢের বেশি লাগে চোখে। স্বচ্ছতা ও বিশুদ্ধতার মাত্রা কিছুটা বেশিই যেন এই রহস্যময় তিব্বতে।

বিমানবন্দর থেকে বের হতেই অপেক্ষমাণ দীর্ঘ গাড়ির সারি চোখে পড়ল। ২০ সিটের মিনিবাস- অন্তত ১০টা। তিব্বত ভ্রমণের দিনগুলোতে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল এসব গাড়ি। যেখানে যাই, আগে পিছে চলে গাড়ির বহর।

নিরাপত্তা ও চিকিৎসা সেবার উপকরণ ছিল এসব গাড়িতে। শহর বা শহরের বাইরে, মেঘের মাঝে, মাউন্টেন পাসে এসব গাড়ি ও তার লোকবল আমাদের কর্ডন করে নিয়ে গেছে সবসময়। এটা সরকারি আতিথেয়তা ছাড়া আর কিছুই নয়। বিদেশি পর্যটকদের যাত্রা নিরাপদ করতে জনসাধারণের যাতায়াত কিছুটা নিয়ন্ত্রণও করা হয়েছে দেখছিলাম। রাজধানী কিংবা জেলা শহরে মানুষের ভিড় খুব একটা বেশি নেই।

যাই হোক, বিমানবন্দরের আতিথেয়তা ছেড়ে আমরা যার যার নির্ধারিত গাড়িতে চেপে বসি। প্রতিটি গাড়িতে ছিল একজন ইংরেজি ভাষা জানা তিব্বতি ট্যুর গাইড, একজন চিকিৎসক, ২/১টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও ওষুধপত্র। ভাবছিলাম, এসবের কী প্রয়োজন? উত্তর মিলল কিছুক্ষণ পরেই।
গাইড জানালেন, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কয়েক হাজার মিটার উঁচু স্থান হওয়ায় তিব্বতের মোটামুটি সবখানেই অক্সিজেনের পরিমাণ কম। সাধারণ মানুষ খুব সহজেই এসব স্থানে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ‘হাই অ্যালটিচুড সিনড্রোম’ দেখা দেয় সহসাই। এর মোকাবিলায় বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিল গাইড তরুণীটি। সার্বক্ষণিক পানি পান ও ধীরে চলাফেরার নীতি অবলম্বন করতে বলল গাইড। কিছুটা ভয়ে নির্দ্বিধায় মেনে নিল দলের সবাই। না-জানি কী অসুস্থতার ঝামেলা হয়—এ আতঙ্কে ছিল নতুন অনেকেই।

তবে সে আতঙ্ক বেশিক্ষণ ভর করতে পারেনি। গাইডের কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে চারপাশের জানালা দিয়ে অবর্ণনীয় যে সৌন্দর্য চারদিকে হাতছানি দিচ্ছিল, তার বর্ণনা করার উপায় নেই! পার্বত্য পথ ও দু’ধারের তিব্বতি ধাঁচের বাসা-বাড়ি ভেদ করে এগিয়ে চলেছে আমাদের গাড়িবহর। গন্তব্য হোটেল নয়। যদিও সেটা হলেই ভালো হতো। ভোর রাত থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত যাত্রার পর সবাই বেশ ক্লান্ত। তার ওপর এমন সুন্দর প্রকৃতির চাপে সবাই খানিকটা ধাতস্থ হবার জন্য বিশ্রাম নিতে চাইছিল। কিন্তু তা সম্ভব নয়।

অল্প দিনের সফরে সর্বোচ্চ পরিদর্শনের তাড়াও ছিল সবার। তিব্বত প্রশাসন তার উন্নয়নের কিছুটা নিদর্শন দেখানোর জন্য উদগ্রীব ছিল। আর সেটি দেখতে একটি গ্রামের দিকে ছুটে চলল আমাদের গাড়িবহর। আমরা তখনও নিংছ্রি বা লিনচ্রি শহরেই রয়েছি।
চলবে..