নিংছ্রি প্রিফেকচারের দর্শনীয় স্থান: নিংছ্রি এলাকার জনজীবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মনোরম ও অতুলনীয়। এ এলাকার বেশকিছু স্থান যেন আপন সৌন্দর্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। উঁচু এলাকা হলেও পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন থাকায় পর্যটকদের শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যায় পড়তে হয় না। এ অঞ্চলের একটা পার্বত্য এলাকাকে তিব্বতের সুইজারল্যান্ড নামকরণ করা হয়েছে।
ইয়ালুং চাংপো গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন
এখানকার প্রকৃতি, গিরিখাত ও নদী (ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস) দর্শনীয় স্থান। বছরের গ্রীষ্ম ও শরৎকালে এখানে আরামদায়ক পরিবেশে ভ্রমণ করা যায়। এই স্থানটি ছিংহাই-তিব্বত মালভূমির ‘ছাদে’ সবচেয়ে রহস্যময় অঞ্চল হিসাবে খ্যাত। এটি বিশ্বের সবচেয়ে গভীর, দীর্ঘতম, সর্বোচ্চ ও বিপজ্জনক একটি গিরিখাত; এর গভীরতা ৫৩৮২ মিটার!
লুলাং ফরেস্ট
নিংছ্রি শহর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে, চীনের ৩১৮ নম্বর জাতীয় মহাসড়কের পাশে ‘লুলাং বনভূমি উদ্যান’ অবস্থিত; সহজ গন্তব্য স্থান। উল্লেখ্য যে, ছাপা বা ডিজিটাল ম্যাপগুলোতে নাম ও নম্বরসহ জাতীয় সড়কগুলো সহজেই চোখে পড়ে। তাই পথ হারাবার আশঙ্কা কম। প্রাকৃতিক এই উদ্যানটির শ্বাসরুদ্ধকর আকর্ষণীয় সৌন্দর্য রয়েছে। ৩৭০০ মিটার উঁচুতে আলপাইন দৃশ্যাবলীর জন্য লুলাং বনভূমি বেশ বিখ্যাত। মালভূমির এই পর্বতশৃঙ্গে ভিন্ন ধরনের গাছপালা ও লতা-গুল্ম চোখে পড়ে।
আবহাওয়া ভালো থাকলে, পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও মেঘ সরে গেলে বহুদূরে মাউন্ট এভারেস্টের বরফাবৃত চূড়ার হাতছানি দেখা যায় বলে জানা গেলো! স্বপ্নের মতো এ দৃশ্যটি লুলাং ফরেস্টের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ।
বসন্তকালে লুলাং পর্বতাঞ্চলের বনভূমি অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় ফুল ফোটে, বিশেষ করে ফেনিল সমুদ্রের মতো আজেলিয়া ফুলের ঢেউ খেলে যায়। গ্রীষ্মকালের মৃদু বাতাস উপভোগ্য হলেও তা কিন্তু গরম নয়! শরৎকালে চীনের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রং-বেরঙের গাছপালা-সহ লুলাং টাউনের তিব্বতি গ্রামীণ জীবন উপভোগ করা যায়। আর শীতকালে, তুষার-ঝরা বনভূমির পাশাপাশি হিমবাহ এবং শ্বেত-শুভ্র স্বপ্নিল জগত ধরা-ছোঁয়ার মধ্যে এসে হাজির হয়।
ইয়ালুং চাংপো নদী ও গিরিখাত:
এটি হিমালয়ের মধ্য চলে যাওয়া নদী হলো ইয়ালুং চাংপো। এটি তিব্বত থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের ব্রহ্মপুত্র নদ হয়ে অবশেষ বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। দীর্ঘ এই নদীটি উৎসমুখে নিংছ্রি কাউন্টিতে ইয়ালুং চাংপো গিরিখাত তৈরি করেছে। বিখ্যাত এই উপত্যকাটি ৪৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ; যা মার্কিন মুল্লুকের গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের চেয়েও গভীর। এটি প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের গভীরতম উপত্যকাগুলির একটি। এর বিভিন্ন দৃশ্য এতটাই আকর্ষণীয় ও ভিন্ন রকম যে- একে ‘গ্রহান্তরের রহস্যময় জগৎ’ বলে উল্লেখ করা হয়। আর এই গিরিখাতটি অবশ্যই পায়ে হেঁটে ভ্রমণ করতে হবে।
নি-ইয়াং নদী
এই নদীটি তিব্বতের সুন্দরতম খরস্রোতা নদী। ব্রহ্মপুত্র বা ইয়ালুং চাংপো নদীর শাখা নদী এটি। পশ্চিমের মিরা পর্বতে নদীর উৎস; যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ৫০০০ মিটার উঁচুতে। সেখান থেকে পূর্বমুখী স্রোতধারা নিংছ্রি কাউন্টির ছেমেং পর্যন্ত গিয়ে ইয়ালুং চাংপো’র সঙ্গে মিলেছে। অনেক উঁচু থেকে প্রবাহিত হয়ে মিনিটে ৫৩৮ ঘনমিটার বা বার্ষিক ২২ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে এ নদীর দুধারে স্রোতের সঙ্গে বয়ে আসা ছোট-বড় পাথরের টুকরা দেখা যায়।
স্থানীয়রা একে কখনও কংপো জনগোষ্ঠীর মাতৃনদী, কখনওবা ‘পরীর অশ্রুধারা’ বলে আখ্যায়িত করে।
নিংছ্রিতে এই নদীর তীর ঘেঁষেই তৈরি হয়েছে নিইংছ্রি উচৌ ক্রাউন হোটেল; যেখানে দিনে-রাতে পাথর ভাসিয়ে নেওয়া স্রোতধারার আওয়াজ শুনেছিলাম। এই নদীর স্বচ্ছ সবুজ প্রবাহিত পানি সবাইকে মুগ্ধ করে। সকাল ও সন্ধ্যায় কুয়াশা ও মেঘের অদ্ভুত এক মেলবন্ধন দেখা যায়। মেঘ যেন ভেসে বেড়ায় নিইয়াং নদীর স্রোতে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে—অনেকটা হাতের নাগালে! কোথাও পর্বতমালার গায়ে বাধা পেয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে শুভ্র মেঘমালা।
কখনও কখনও পাথুরে নদীর তীর ঘেঁষে ছুটে যায় দুরন্ত ঘোড়ার দল! অদ্ভুত সুন্দর এসব দৃশ্য নিইয়াং নদীর উপরের দিকে বৃহৎ ও সমতল ভূমি রয়েছে, অন্যদিকে নীচের দিকে উভয় তীরে রয়েছে ঘন বনভূমি ও পর্বতসারি। স্বচ্ছ নীল-সবুজ পানিতে গাছ-পালার সবুজাভ প্রতিচ্ছবি বিস্ময় জাগিয়ে তোলে।
নিংছ্রি থেকে লাসা যাবার পথে মিরা পর্বতের নির্দিষ্ট একটি রুট ধরে এগুলে নিইয়াং নদীর উৎসমুখে পৌঁছানো যায়। এই মিরা পর্বত মূলত লাসা নদী ও নিইয়াং নদীর সংযোগ/সম্মিলিত জলাধার (‘watershed’)।
নামচাবাওয়া পর্বতশিখর
গোটা চীনের সবচেয়ে সুন্দর তুষার-ঢাকা পর্বতশিখর (snow-capped mountain) নামে এটি পরিচিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭৭৮২ মিটার উঁচুতে হিমালয় পর্বতমালার পূর্ব প্রান্তে মিনলিং কাউন্টিতে অবস্থিত স্বর্গীয় সৌন্দর্যের আধার এই পর্বতশিখর।
তিব্বতি ভাষায়, নামচাবাওয়া শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো ‘জ্বলন্ত বজ্রপাত’। স্থানীয় রাজা গেসারের মহাকাব্যে নামচাবাওয়াকে ‘আকাশে বিদ্ধ বর্শা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর বর্ণনাতীত সৌন্দর্য ও স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো আবিষ্ট শক্তির কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এ চূড়াকে ‘দেবতাদের অন্যতম আবাস’ হিসাবে পূজা করা হতো।
নামচাবাওয়া-এর আশেপাশে পর্যটকদের থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত আছে। সন্নিকটেই ইয়ালুন চাংপো ব্রহ্মপুত্র গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন ও মেদগ প্রাকৃতিক সংরক্ষিত অঞ্চল রয়েছে। প্রচণ্ড শীতকাল এড়িয়ে গ্রীষ্ম ও শরৎকালেই এ অঞ্চলের মোহনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।