বৃষ্টিদিনে নিজেকে চেনার মুহূর্তগুলি ॥ হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়


বৃষ্টিদিন আমার দুঃখের দিন। একেবারে ছোটোবেলার দিনগুলোতে তখন আমার বয়স এগারো কি বারো বৃষ্টি শুরু হলে দুয়ারে এসে বসতাম। আমাদের মাটির বাড়ি তাই বৃষ্টিকে উপভোগ করার সুযোগ আমার কেনোদিনই হয়নি। তাছাড়া ঘরের জানালাগুলো এমন দিকে ছিল যে সেখানে বসে বৃষ্টিকে দেখার সুযোগ পাইনি। বাধ্য হয়ে মাটির দুয়ারে এসে বসতাম। বাড়ির ভেতর জল জমত। দুয়ারে বসে বসে দেখতাম জল কতখানি বাড়ল।

রাতের বেলা বাবার সঙ্গে শুয়ে আছি। গভীর ঘুমের মধ্যে ডুবে। হঠাৎ মনে হল আমার পেটের ওপর ফোঁটা ফোঁটা জল এসে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে তখন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। বুঝতে পারলাম খড়ের চাল ভেদ করে বৃষ্টির জল ঘরের মধ্যে। দেখি বাবা ঘুমের মধ্যে নাক ডাকছে। বাবাকে ঠেলে ঘুম থেকে তুলে বিছানা গুটিয়ে ঘরের এককোণে আমরা সরে যাই। বাকি রাত মেঝেতে বসে দেওয়ালে হেলান দিয়ে কিছুটা জেগে কিছুটা ঘুমিয়ে কেটে যায়। এমন কত রাত যে বৃষ্টির সঙ্গে জেগেছি তা গুনে শেষ করা যাবে না। কোনোদিন বাবাকে এর জন্যে কষ্ট পেতে দেখিনি। বরং সেটাই হওয়া উচিত ছিল। কারণ সন্তানকে স্বাচ্ছ্বন্দ্য দিতে না পারার অপারগতা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু না। বাবা চুপ থেকে এটাই আমাকে পরোক্ষে শিক্ষা দিত, এটাই জীবন। তোমার সৌভাগ্য যে, এত ছোটো বয়সে জীবন তোমাকে সংগ্রামের মুখোমুখি হওয়ার সু্যোগ করে দিচ্ছে। বৃষ্টিদিন এইভাবেই আমাকে প্রতি রাতে একটু একটু করে জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞ করে তোলে।

স্কুল থেকে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরতাম। যাতায়াতের পথে একটা বটগাছ পড়ত। বটগাছের গায়েই একটা শিবমন্দির। স্কুল থেকে ফেরার পথে বটগাছের কাছে এসে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়াতাম। আসলে ওটা ছিল আমার একটা আশ্রয়। মনে হতো আমার কতো দিনের চেনা। বৃষ্টি পড়লে আমার বটগাছের কাছে খুব যেতে ইচ্ছা করত। বাড়ির লোকের চোখ এড়িয়ে কোনো কোনো সময় পালিয়েও যেতাম। বৃষ্টির একেবারে শুরু থেকে সেই যখন মেঘে মেঘে আকাশ কালো হয়ে আসতো তখন থেকে বটগাছের নীচে থেকে এক মুহূর্তের জন্যেও নড়তে ইচ্ছা করত না। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু বটগাছের নীচে তখনও পর্যন্ত শুকনো। ঠিক মনে হতো আমার দাদু। বৃষ্টির হাত থেকে নাতিকে আগলে রেখে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর থেকেই গায়ে এক ফোঁটা দু ফোঁটা করে বৃষ্টির জল এসে গায়ে লাগতো। তখন মনে হতো দাদু তার নাতিকে হাজার হাত দিয়ে বৃষ্টির ছোঁয়া দিচ্ছে। আরও সময় গেলে ভিজে একেবারে চান করে যেতাম। দেখতাম বটগাছের সারা শরীর দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। নাতিকে সঙ্গে পেয়ে বর্ষার বৃষ্টিতে দাদু চান না করে পারে।

হাঁটতে হাঁটতে যেদিন মাঠের গভীরে চলে যেতাম সেদিন চলার আনন্দেই ভুলে যেতাম বর্ষাকালের কথা। আসলে দুপুরের রোদ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। সেই ডাক যে আমাকে অনেক কিছু ভুলিয়ে দিত। মাথার ওপর রোদ্দুর মুছে গিয়ে কখন যে এক আকাশ মেঘ এসে হাজির হয়েছে চোখেই পড়ে নি। যখন খেয়াল পড়ল তখন গায়ে বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। ফিরে আসার পথে দু-এক পা এগোতেই শুরু মুষলধারে বৃষ্টি। যাওয়ার পথে রোদ মাখার আনন্দ আর ফিরে আসার পথে বৃষ্টি মাখার আনন্দ। মনে হতো রাতারাতি আমি কত বড় হয়ে গেছি। দেখতাম কাছে দূরে অনেক মানুষ মাঠে কাজ করছে। ওরা ভিজলে ওদের যেমন কেউ বকার নেই। আমিও এখন ঠিক ওদের মতো। ওই বয়সে হঠাৎ করে বড় হয়ে যাওয়ার আনন্দের যে স্বাদ বর্ষার বৃষ্টি আমাকে তা প্রথম এনে দিয়েছিল।

মন খারাপের দিন অথবা যেদিন সকাল থেকে আকাশ মেঘলা থাকত সেদিন নিজেকে খুঁজে পেতাম না। কোথাও যেন আমার একটা তাল কেটে গেছে। আমি যে কার, কোথায় যে আমার সুর বাঁধা আছে কিছুই বুঝতে পারতাম না। চার দেয়ালের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখা খুব কঠিন হয়ে পড়ত।

উদ্দেশ্যহীন বেরিয়ে পড়া আমার একটা নেশা আর তখন আমি তাই করতাম। বয়স ষোলো কি সতের, সবেমাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছি। সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে যেতাম। কোনো সেতুর পাশে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ বসে থাকতাম। একটু পরেই বৃষ্টি শুরু হতো। চুপচাপ বসে বসে ভিজতাম। কেন জানি না খুব কষ্ট হতো। কিসের যে কষ্ট বুঝতে পারতাম না। আজও বুঝতে পারি না। মনে হতো আমার যেন কেউ নেই। খুব ছোটোবেলা থেকে আমি যে একা, এই বিশেষ বিশেষ মুহূর্তগুলো আমাকে আরও বেশি করে চিনিয়ে দিত। এত কষ্ট হতো যে কাঁদতাম। মাথার ওপর বৃষ্টি ঝরতেই থাকত তাই কান্না লুকানোর কোনো অসুবিধা হতো না। আর যেহেতু বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে তাই চেনা মুখের দেখা পেতাম না যে আমাকে দেখে বাড়ি চলে যাওয়ার কথা বলবে। ওই বৃষ্টির মধ্যে চারপাশে কেউ নেই। যতদূর চোখ যায় শুধু বৃষ্টি আর বৃষ্টি। জীবনে প্রথম বৃষ্টি আমাকে একা করে দেয়। সকলের আড়ালে নিয়ে গিয়ে নিজেকে বিশেষ ভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়।