বইয়ের সাথে সখ্যতা আমার ছোটবেলা থেকে। তবে কবে থেকে বই পড়া শুরু করেছিলাম মনে করতে না পারলেও, কবে থেকে ছেঁড়া শুরু করেছিলাম, দিব্যি মনে আছে।স্কুল ভর্তির প্রথমদিন থেকেই আমার বই ছেঁড়া অপকর্মের সূচনা।নার্সারিতে রাইমসের রঙিন বইগুলো ছিঁড়ে সেগুলো দিয়ে পুতুল বানিয়ে খেলতাম৷মনে হয় তখন থেকেই আমার বই পড়ার শুরু।এখন বইয়ের পাতা ভাঁজ করলেও কষ্ট হয়।মনে হয় বইগুলো ব্যাথা পাচ্ছে।থাক ওসব কথা। আমার বই পড়া শুরুর গল্পটা বলি।
ছোটবেলায় নানারকম শিশুতোষ গল্পের বই আমাকে পড়তে দেওয়া হতো।তবে আমি একটু ইঁচড়েপাকা হওয়ার কারণে বড়দের বই পড়তেই বেশি পছন্দ করতাম। ‘রুশদেশের উপকথা’ আমার পড়া প্রথম শিশুতোষ বই।বাসায় হঠাৎ একদিন খুঁজে পেয়েছিলাম ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ উপন্যাসটি।মাকে জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন,ওটা নাকি বাবার বই। যেন না ধরি। তবে আমি মায়ের নিষেধ না শুনে মা উপন্যাসটি পড়েছিলাম অনেকটা ছোট বয়সে। উপন্যাসের নায়ক পাভেল ভ্লাসভ আর তাঁর মা পেলেগোয়া নিলভনা দুটো চরিত্র ম্যাক্সিম গোর্কির অনবদ্য সৃষ্টি।বইটা পড়ার পরে আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওটা আসলে মায়ের বই ছিলো। কারো থেকে ধার এনেছিলো পড়ার জন্য হয়তো কখনো।কেননা আমার ছোট ভাইয়ের জন্মের পরে, মা ওর নাম রেখেছিলো ‘পাভেল’। পাভেল চরিত্রটি হয়তো তাকে এতটাই বিমোহিত করেছিলেন যে, ছেলের নামটি তিনি পাভেল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।আমার বই পড়ার স্বভাবটা আমি মায়ের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলাম।
ছোটবেলায় বাসায় বিভিন্ন ধরনের পত্রিকা রাখা হতো। মায়ের প্রিয় ছিলো বেগম পত্রিকা।পত্রিকাটি বাসায় এলেই আমি পত্রিকার পাতা উল্টেপাল্টে দেখতাম আর ঘ্রাণ নিতাম। সেই থেকে আজও বাসায় নতুন বই এলে আমি প্রথমে সেই বইয়ের ঘ্রাণ শুঁকি।জানিনা কার কেমন লাগে নতুন বইয়ের ঘ্রাণ। আমার নেশা নেশা লাগে।মনে হয় ঢুকে পড়ি বইয়ের প্রতিটি অক্ষরে, শব্দের ভেতরে, আর শুষে নিই প্রতিটি বাক্যের গদ্য সৌন্দর্য ।
এখনও মনে পড়ে বিভিন্ন রান্না, সেলাই, গল্প, সবই পড়তাম বানান করে করে। এখন সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে হাসি পায়। আমার কাছে রান্নার বই বলতে এখনও প্রিয় সিদ্দীকা কবির রেসিপি, ওই বইখানি।
আরও কিছুসময় পরে পড়তাম দেশ পত্রিকা, সানন্দা। আনন্দলোক পড়ার থেকে আমি দেখেই বেশি আনন্দ পেতাম।কি ঝকঝকে মলাট, রঙিন সব ছবি।একসময় সানন্দা ও দেশ পত্রিকার উপন্যাসগুলো পড়া শুরু করি (তখন হয়তে ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি।)
সেই সময় আমাদের বাসায় পত্রিকা দিতো আসতো বাবুল কাকা। আমাদের পাড়ার হকার।তার সঙ্গে অনেক সখ্য ছিলো। হয়তো আমার পড়ার আগ্রহের কারণে আমাকে একটু বেশি আদর করতেন।এমনও হয়েছে, বাবুল কাকা আমাকে পত্রিকা দিয়ে যেত একদিনের জন্য। আমি সেই পত্রিকা একদিনে পড়ে শেষ করতাম।যেন পরীক্ষার পড়া, একরাতে সিলেবাস শেষ করতে হবে। আমার সেই পত্রিকা, বইগুলো এখন বাসায় জমানো আছে (মায়ের বাসায়)।
বই সংগ্রহ করার জন্য আমি সব পত্রিকা ও গল্পের বইগুলোতে একটা নম্বর দিয়ে রাখতাম।মাঝে মাঝে মিলিয়ে নিতাম সব নম্বর দেওয়া বইগুলো। হঠাৎ কখনো কোন বই মিসিং হলে কাঁদতাম।
কৈশোরে চাচা চৌধুরী, মাসুদ রানা,আর সেবা প্রকাশনীর সেই রোমান্টিক গল্প গুলি পড়তাম ।তবে সেগুলো বেশ চুরি করে, বড় বইয়ের ভেতরে ছোট বই ঢুকিয়ে পড়া, কত ধরা পড়েছি মায়ের হাতে, গালমন্দের সাথে চড় থাপ্পড় থাকতো বোনাস হিসেবে।আমার সেই করুন ইতিহাস বলে শেষ হবে না।
ক্লাস এইটে থাকাকালীন শীর্ষেন্দুর দূরবীন পড়ে আমি তো ধ্রুবর প্রেমে পড়ে গেলাম।সাতকাহনের দীপার মতো হতে চাইতাম।একবার তো মাকে বলেই ফেললাম, আমাকে দীপার মতো ছোটবেলায় বিয়ে দিতে, আমিও তাহলে ভালোভাবে পড়াশুনা করবো। নন্দিত নরকে উপন্যাসটি দিয়ে শুরু হলো হুমায়ুন আহমেদ এর বই পড়া।আমি প্রথমে পড়ে কিছুই বুঝি নাই।তখন আসলে ওটা বোঝার জন্য যে পরিমাণ বুদ্ধি দরকার ছিল, সেটা তখনও হয়নি আমার।তবে আমি পড়েছিলাম।আজ যখন মেয়েকে এমনভাবে গল্পের বই পড়তে দেখি, তখন নিজের সেই ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়।আমার মা প্রায় সময় বলতো, তুই যতটা মন দিয়ে গল্পের বই পড়িস, তেমন করে যদি লেখাপড়া করতি, তাহলে আমার আর কোন কষ্ট থাকত না।
কলেজে ওঠার পড়ে শুরু করলাম বুদ্ধদেব গুহ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলো। সুনীল ও বুদ্ধদেব গুহ এই দুজন লেখকের লেখাকে যদি আমাকে বিবেচনা করতে বলে আমি বুদ্ধদেব গুহর লেখাকে বেশি পছন্দ করবো। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প আমাকে এখনও টানে, তবে কাজী নজরুল ইসলামের বই পড়া হয়নি তেমনভাবে। তবে তার গল্পের কাহিনিগুলো বিভিন্ন দিবসের নাট্যরূপের মাধ্যমে জানা হয়েছিলো। পদ্মা নদীর মাঝি দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর সাথে সখ্যতা শুরু। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুলনাচের ইতিকথা, জননী, ছোটগল্প প্রাগৈতিহাসিক আমার এখনও প্রিয়। জীবনানন্দ দাশের প্রতিটি গল্প পড়ে আমার মনে হয়েছে তিনি তার জীবনের কষ্টগুলোকে তার উপন্যাস ও গল্পে তুলে এনেছিলেন।সেটা আরও বিস্তৃত আকারে জানাতে পারি শাহাদুজ্জামানের ‘একজন কমলালেবু’ পড়ে।শাহাদুজ্জামানের লেখাও আমার ভালো লাগে।
আমার বই পড়ার তালিকায় উল্লেখযোগ্য অনেক বই জমা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। ওয়ার অ্যান্ড পিস উপন্যাসটি আবার শুরু করবো ভাবছি। ইদানীং অনুবাদ পড়া হচ্ছে প্রচুর। হারুকি মুরাকামির প্রায় অনুবাদ গ্রন্থগুলো পড়া শেষ। ইদানীং গল্পপাঠ ওয়েবজিনে অনুবাদ গল্পগুলো পড়ি অফিসে যাওয়া আসার পথে৷ জ্যামের অলস সময়টাকে এখন বই পড়ার পেছনে কাজে লাগাচ্ছি। আশাপূর্ণা দেবী, সুচিত্রা ভট্টাচার্যের লেখা আমার ভালো লাগে। ইদানীং পড়া হয়েছে সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্যান্টি ও অন্যান গল্প’। বাংলা ছোট গল্পের জাদুকর মনে হয় হাসান আজিজুল হক। তার দেশভাগ নিয়ে লেখা আগুনপাখি উপন্যাসটি আমাদের সাহিত্যের একটি ক্লাসিক উপন্যাস। আরও আছে শওকত আলীর প্রদোষে প্রাকৃতজন, মাহমুদুল হকের অনুর পাঠশালা ভালো লেগেছে।শহীদুল জহীরের মুখের দিকে দেখি, আবু ইব্রাহীমের মৃত্যু উপন্যাস দুটো আমার প্রিয় বইয়ের তালিকায় থাকবে। নাসরীন জাহানের লেখা আমাকে টানে। কিছুদিন আগে পড়লাম ওয়াসি আহমেদের বরফকল। এখনকার সময়ে সাদিয়া সুলতানার ঈশ্বরকোল ও মোজাফফর হোসেন তিমিরযাত্রা পড়ার সুযোগ হয়েছে। ভালোবেসেছি তাদের লেখাগুলো।ইশরাত তানিয়া ও নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের গদ্য আমার ভালো লাগে।
এখন সময়ের অভাবে তেমনভাবে পড়ার সুযোগ হয় না। তবে সমস্যা নেই, বুড়ো বয়সটা জমিয়ে রেখেছি।তখন আবার শুরু করবো বই পড়া। এখন যা পড়ছি সেগুলো তো বোনাস।তবে আমি চেষ্টা করছি আমার বাচ্চাদের ভিতরে বই পড়া অভ্যাসটা গড়ে তুলতে।ইদানীং মনে হয় আমি সেটা কিঞ্চিৎ পেরেছি।