সমুদ্রসমগ্র (পর্ব-২) ॥ সাদিয়া সুলতানা


অলঙ্করণ: লংরিড

২. আমাদের সাদাকালো জাদুবাকশো

যেই ঘরে বসে লিখি সেই ঘর লাগোয়া বারান্দায় সারি সারি টব।মনিটর থেকে চোখ সরিয়ে মাথাটা একটু জাগালেই দেখতে পাই একটা মাঝারি আকৃতির টবে আরামসে বেড়ে ওঠা ক্ষীরী বৃক্ষ টগরের দুধ সাদা ফুল।ঐ থোকা থোকা শুভ্র পাপড়ির আড়ালে গোঁজা মৃদু ঘ্রাণ উন্মনা করে।মন ফিরলে কুঞ্জলতার সরু পাতার ভীরু কাঁপন দেখি, দরজায় এলিয়ে থাকা বৃষ্টিধোয়া বাতাস স্পর্শ করি।স্পর্শ করি আঁচলে লুটিয়ে পড়া পাতার সবুজ।

এই সবুজ আনন্দ দেয়, বিহ্বল করে।দৃষ্টিসন্ধিতে বিভ্রম তৈরি করে।সবুজ সবুজ মায়া একসময় দুচোখ ঝাপসাও করে তোলে।ঝাপসা দৃশ্যপটে স্পষ্ট হতে থাকে একটি কিশোরীর মুখ।শীর্ণ গড়ন, সাদামাটা শ্যামলা মুখশ্রী, ছোট ছোট চোখ, ভ্রু সন্ধিতে টিপ আকৃতির একটা ছোট্ট আঁচিল।ঐ কিশোরীকে তার ডাকনাম ধরে ডাকলে এখন অনেকেই চিনবে না।

এক সময় চিনতো কেউ কেউ।সবচেয়ে বেশি চিনতো কিশোরীর বাবা।
মিতা, রিতা, মুনমুন, জিকু, বিপাশা…বাবাই প্রথম ওদের চেনে, পৃথিবীকেও চেনায়।কিন্তু এই এইটুকুন বুদ্ধি তখন ওদের।আর টিলো এক্সপ্রেস, বরফ পানি, ইচিং বিচিং চিচিং ছার ঝুঁটি বাঁধা দুরন্ত শৈশব-কৈশোরের কার্যকারণহীন খলবল ছটফটানির দিন।তাই হয়তো ভাইবোন কারোই কোনো কিছুর সঙ্গেই তেমন করে পরিচয় ঘটতো না।ভাবতো, বাবা তো আজীবনই থাকবে; সব চিনে-বুঝে-জেনে-শিখে রাখার দরকার কী।বাবা ছাড়া কাউকে দরকার নেই, কিছুরই দরকার নেই।তাই দরকারে-অদরকারে ডাক পড়তো বাবার।বাবার ডাকাডাকিও শোনা যেত ভোর হলেই।

হ্যাঁ, কুসুম কুসুম ভোরে বাবার ঘর থেকে ভেসে আসতো হৈমন্তী শুক্লার কণ্ঠের প্রভাতী সঙ্গীত, ‘ডাকে পাখি খোল আঁখি/দেখ সোনালী আকাশ/বহে ভোরের বাতাস…।’

তখনও ওরা বুঝতো না, রেডিও বা ক্যাসেট প্লেয়ারের সুরে সুরে শুরু হওয়া প্রভাতীয়া লগ্নের মতো ওদের জীবনের শেষ বিলাস হিসেবে সঞ্চয় হয়ে থাকবে বাবার সান্নিধ্যে কাটানো কালটুকুই।তাই ঘুমের বিলাসে ফুলে ফুলে প্রজাপতির দোল দেখার সুযোগ হতো না ভাইবোন কারোই। আলস্যে গড়িয়ে শুধু টের পেতো বাবার ঘরে সকাল এসেছে অনেক আগেই।

বাবার কল্যাণে শুধু সকাল নয়, ঐ বাড়িতে সন্ধেও আসতো দ্রুত।সন্ধে হলেই ঘরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে লতা মঙ্গেশকর গেয়ে উঠতেন, নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়/নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা বুঝিবা পথ ভুলে যায়/কুলায় যেতে যেতে কি যেন কাকলী আমারে দিয়ে যেতে চায়/নিঝুম সন্ধ্যায়…
‘দূর পাহাড়ের উদাস মেঘের দেশে, ওই গোধূলির রঙিন সোহাগ’ মিশে যেতে যেতে রাতও নেমে আসতো দ্রুত।মফস্বলী জীবনে রাত মানেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে ঘুমের সঙ্গে সমঝোতা।

তখন তো আর স্মার্টফোনের যুগ ছিল না যে ঘুমানোর সময় গিলে খাবে। পরিপাটি শোপিসে ঠাসা ড্রইংরুমের আভিজাত্যও ছিল না তখন। মধ্যবিত্তের ঘরে আভিজাত্য বলতে ছিল একটা অতিকায় ল্যান্ডফোন আর মেহমানদের বসার জন্য সংরক্ষিত সোফার ওপরে মায়ের হাতে নকশাতোলা সোফাম্যাট আর কুশন কভার।মেহমান না এলে রোজ সন্ধ্যায় একসঙ্গে পড়তে বসা, পড়া শেষে একসঙ্গে পাত পেতে বসে খেয়ে নিতেই ঘুমানোর সময় চলে আসতো।

অবশ্য টেলিভিশন সচল হলেই ছক বাঁধা রুটিন পাল্টে যেতো।জীবনে আনন্দের সীমাও থাকতো না।চকচকে পেট, ফোলা পিঠের ঢাউস আকৃতির ঐ টেলিভিশনই তখন ছিল ওদের জীবনের একমাত্র জাদুবাকশো।

সেইসব রঙিন দিনে ওদের চমকে দিতে সাদাকালো জাদুবাকশে সম্প্রচারিত হতো বিটিভি।বিটিভি মানেই চারকোনা এক লোগো, বাসার ছাদে বাঁশের আগায় ঝুলানো টিঙটিঙে বাহুর একটা অ্যান্টেনা, টেলিভিশনের পেছনে জ্যাকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জানালার গ্রিলের ফাঁক গলে যাওয়া দীঘল কালো তার আর ঝিরঝির ঝিরঝির ব্যাকগ্রাউন্ড।

শুধু ওদের কেন, ঐ ঝিরঝিরে ব্যাকগ্রাউন্ডেই মধ্যবিত্ত প্রতিটা পরিবারের রংধনু জীবনের বিলাসী মুহূর্তগুলো আটকে থাকতো।

পরের পর্ব পড়ুন : বিটিভির সঙ্গে