সমুদ্রসমগ্র (পর্ব-৩) ॥ সাদিয়া সুলতানা


অলঙ্করণ: লংরিড

৩.বিটিভির সঙ্গে
নিজের কথাগুলো গুছিয়ে বলা খুব মুশকিল।যতই সাজাতে-গোছাতে যাই, সবকিছু যেন তত অগোছালো হয়ে পড়ে।মাঝেমাঝে মনে হয়, অন্যের জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার প্রবণতা থাকলে নিজেরটা দেখা সম্ভব হয় না কখনও।তাই ভাবি যখন, লিখি যখন আমার অভ্যন্তরে তখন ঢুকে যায় অনেক আপনজন অনেক অপরজন।তাই হয়তো যার জন্য কাঁদা উচিত না তার জন্য কাঁদি, যাকে নিয়ে ভাবা উচিত না তাকে নিয়ে ভাবি।যার জন্য কথা বলা উচিত না তাকে নিয়েই বলি।নিজেকে নিয়ে ভাবার ফুরসৎ কোথায়!

সময় নেই-এ এক প্রকার মিথ্যে অজুহাত।আসলে দিনের কথাগুলো খেয়ে ফেলে চারকোণা বাকশের উইপোকা, কানের কাছে কুটুরমুটুর শব্দে মিথ্যে মন্ত্র আওড়ায়, ‘ভালোবাসি গো ভালোবাসি।’ ওদিকে রাত নামলেই তন্ত্রমন্ত্রের ভালোবাসা হয়ে যায় হাওয়ার বুদবুদ কিংবা উড়াল মেঘ, ধরতে গেলেই অতিকায় ডানা লাগিয়ে সে নাগালহীন আকাশে মিলায়।

খুব চাইছি, রাত্রির পথ ধরে আজ জোছনা নামুক, যেই জোছনায় ডুবসাঁতার কাটতে কাটতে তার সঙ্গে পাড়ি দেবো কথার সমুদ্দুর।
তাই তো মনে মনে কথা সাজাই, স্মৃতি সাজাই…মনে পড়ে সেই ছোটবেলায় ‘এটা করিস না, সেটা করিস না, ওটা ধরিস না…ওখানে যাস না’…মায়ের কড়া শাসন শিথিল হলে প্রতিদিন টেলিভিশন দেখার অনুমতি মিলতো।

তখন টেলিভিশন মানেই ছিল বিটিভি।আর বিটিভি মানেই ছিল কার্টুন শো পাপাই দ্য সেইলার ম্যান, থান্ডার ক্যাটস, ক্যাপ্টেন প্লানেট, টম অ্যান্ড জেরি, উডি উড পেকার, টিনেজ মিউট্যান্ট নিনজা টারটেলস।
বিকালের কার্টুন ছাড়াও প্রিয় ছিল ‘আলিফ লায়লা।’ আলিফ লায়লা ও ও ও ও ও ও…টাইটেল সং শুরু হলে যেখানেই থাকতাম ছুটে আসতাম। মুখস্থও ছিল গানটা-দেখ সব নতুন কাহিনি/মন ভরে দেয় তার বাণী/কত যুগ পেরিয়ে গেছে/নতুন তবু রয়ে গেছে।’

সিন্দবাদ, টারজান, দ্যা এক্স ফাইলস, দ্য গার্ল ফ্রম টুমরো, ম্যাকগাইভারের সূচনা সঙ্গীতের সেই মোহময় সুর…তিন হাজার সাল থেকে বর্তমানে চলে আসা দ্য গার্ল ফ্রম টুমরোর অ্যালানার মাথার ব্যান্ড, দ্যা এক্স ফাইলসের ফক্স মোল্ডারের হাসি, ডানা স্কালির হেয়ার কাট, ম্যাকগাইভারের বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি…সবকিছু নতুন রয়ে গেছে। বদলে গেছে শুধু সময়।

একটা সময়ে ঘরে ঘরে বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ ছিল শুক্রবারের সিনেমা। সম্ভবত দুপুর তিনটা বিশের দিকে শুরু হতো বাংলা সিনেমা। তখন শাবানা, আলমগীর জুটির সিনেমা দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতো অনেকেই। আর আমরা মুখ টিপে টিপে হাসতাম ফুলে ফুলে টোকাটুকি আর এই দৃশ্যের পরপরই শাবানার আচার খাওয়া দেখে।কী বুঝতাম কে জানে, গানের দৃশ্যগুলোতেও এ ওর দিকে তাকিয়ে বাঙময় হাসতাম।
মনে পড়ে, তখন বিশেষ কয়েকজন সংবাদ পাঠকের জন্যই কেবল টেলিভিশনের সামনে অপেক্ষা করতাম না বিশ্ব নাটক আর প্রিয় প্রিয় কিছু বিজ্ঞাপনের জন্যও অধীর হয়ে বসে থাকতাম।

পড়া শেষ হলে টেলিভিশনের সামনে বসার অনুমতি মিলবে এই আনন্দে যেন পড়াও মুখস্থ হতো তাড়াতাড়ি।পড়া শেষ হলেই আর পায় কে!
আমজাদ হোসেনের ঈদ নাটকের সংলাপ ‘টেকা দেন দুবাই যামু’, ‘জবা, কুসুম, রোকন, দুলালের মা’, হুমায়ূন আহমেদের বহুব্রীহি নাটকের ‘তুই রাজাকার’ বলা টিয়ে পাখি, অয়োময় নাটকের ছোট মির্জা, এলাচি বেগম আর শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে সম্প্রচারিত নাটক ‘সংশপ্তক’র হুরমতি, কানকাটা রমজান, রাবু আপা, মালুকে মনে পড়ে আজও।

মনে পড়ে বিজ্ঞাপন বিরতি…‘যুগের সাথে চলো, ইকোনো লিখে ভাল, ইকোনো সবার প্রিয়, ইকোনো বলপেন’…‘আলো আলো বেশি আলো’…‘তুমি সেই তুলনাহীনা’…‘ও মানিক কী বাত্তি লাগাইলি’…‘প্রিয় প্রিয়’…‘মনে পড়ে মনে পড়ে ফেলে আসা ছেলে বেলা, মনে পড়ে মনে পড়ে হৃদয় মেলতো পাখা… ‘হারানো সেই দিন, মনে আছে যেনো এখনো সজীব যেনো হয়নি বিলীন…মনে আছে সেই নীল খাম, চিঠি?’

মনে পড়ে, বাসার ছাদে লম্বা বাঁশের মাথায় লাগানো থাকতো টেলিভিশনের এন্টেনা।মেজো আপা ছুটে গিয়ে ছাদে থাকা টিভির এন্টেনা ঘুরাতো আর থেকে থেকে জানতে চাইতো, ‘হইছে…হইছে?’ ঘর থেকে বড় আপা চিৎকার করে জানান দিতো, ‘হয় নাই…।’ আচমকা, ‘হইছে’ শুনতে পেলেই সিঁড়িতে মেজোর ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ পাওয়া যেতো, ‘ইস, প্রথমটুকু মিস হয়ে গেলো।’

ঐ বয়সটাতে কিছু ‘মিস’ হয়ে গেলেও কিছুই হারাতো না। আর এখন সামান্য কিছু ‘মিস’ হলে সবই যেন হারিয়ে যায়।

পরের পর্ব পড়ুন : হিম হিম আইসক্রিম দিন