সমুদ্রসমগ্র (পর্ব-৫) ॥ সাদিয়া সুলতানা


৫. নারী হয়ে ওঠার দিনে
কোনো কোনো ভোরে সময় প্লাবিত হয় একটু একটু করে, একটা মেয়ের নারী হয়ে ওঠার দিনগুলোর মতো ধীরে সুস্থে।যেই রহস্যময়তার ভেতরে ধীরে ধীরে তার পূর্ণ হয়ে ওঠা, সেই রহস্য যেন অচেনা অদেখা এক আলোর প্লাবনে ভাঙে।ভোর ভেঙে সকাল ফোটে, সকাল হয় রোদ; রোদ নিভে গিয়ে প্রগাঢ় রহস্যময়তার রাত এসে সন্ধেকে ঢেকে দেয়।

সন্ধে আর রাতের সূক্ষ্ম ফারাক যেমন বোঝে না মেয়ে তেমনি বোঝে না কবে সে নারী হলো।এ যাত্রা তার একার।পথও অচেনা।গোপন সুড়ঙ্গ পথে একা একা হামাগুড়ি দিয়ে যে গন্তব্যে সে পৌঁছায় দেখে সেখানে আলোর সমপরিমাণ অন্ধকার।অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে একসময় অঢেল আলোর দেখে মেলে, নিজেকে দেখারও অবসর হয়।

তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গড়ন পাল্টায়, দেখার ধরন পাল্টায়।এই দেখার প্রতিশব্দ অনেক হলেও মাধ্যম দুটো; নিজের ও অন্যের দৃষ্টি দিয়ে দেখা।

মেয়ের দৃষ্টি দেখে ঢেউ আর লাবণ্য।বাদবাকি সকলে দেখে শরীর আর বৃদ্ধি।দেখতে দেখতে বলে, ‘ও রে…তুই দেখি বড় হয়ে গেছিস!’ এই বড় হয়ে ওঠা মানে যে শুধু বেড়ে ওঠা নয় তা বোঝে শুধু ঐ মেয়ে।

ঐ মেয়ে আমি।ঐ মেয়েই তুমি।ঐ মেয়েই তোমার বোন, মা, স্ত্রী, প্রেমিকা।ও মেয়ে খোলসভাঙা কুসুম।ও মেয়ে কুসুমকোমল মনোরম। তারপর মনোরম মেয়ে থেকে একদিন নারী হয়ে ওঠা।

নারী হয়ে ওঠা মানে নদী হয়ে ওঠা।নদীর থাকে জল।সেই জলের অপর নাম কান্না।আমিও কাঁদি, একা একা কেঁদে কেঁদে দীর্ঘ এক নদী হয়ে যাই। আর অর্নিণীত সব বেদনার প্রতি হাজারো শব্দ লিখতে থাকি।
এবার তবে অতীতের দিকে যাই, আরও শত শব্দ লেখা জরুরি অতীতের প্রতি।

একদিন স্যারের ব্যাচ থেকে ফিরে টের পেলাম, তলপেট মুচড়ে ব্যথা হচ্ছে, থেকে থেকে উরুসন্ধিতে ছোবল দিচ্ছে যন্ত্রণা, প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে রক্তে।বাথরুমের দরজা আটকে ভয়ে কাঁদছি।ও রক্ত কোথা থেকে এলো? পা কেটেছে, উরু কেটেছে? পেটে মস্ত অসুখ করেছে? হাড় মাংস গলে ব্যথারা সব বের হচ্ছে রক্ত হয়ে?
গুমরে গুমরে কাঁদি আর দেখি, এ রক্ত তো কান্নার মতো, কিছুতেই বন্ধ হয় না!
মায়ের ওপর রাগ হয়, বোনদের ওপর হয় অভিমান, প্রাণের বন্ধু রুমকি, কানন, রেহানা, ফৌজি সকলের সঙ্গে মনে মনে আড়ি নিই…কই এরা তো কখনোই বলেনি এভাবে রক্ত ভেঙেই একদিন নারী হয়ে উঠতে হয়?
অভিমানী কান্নায় এভাবে রোজ কত পৃষ্ঠা ভিজে যায়…পাঠ্য বইয়ের আড়ালে লুকানো তিন গোয়েন্দা, সেবা রোমান্টিকের নিউজপ্রিন্ট পাতা সবকিছুতে জলের ছোপছাপ দাগ পড়ে।

মাকে ভয় পাই বলে ঐ বয়সে ‘আউট বই’র মতো বেদনা লুকাই। মা লুকায় ‘আউট জগত।’ জানতে দেয় না কী করে বড় হতে হয়।
বড় হয়ে অনেক পরে বুঝেছি, আসলে জানাতে যে হয় মা তা নিজেই জানে না।

পরের পর্ব পড়ুন : শবেবরাতের বরাত