শানজানা আলমের ‌‘জল মিশে যায় জলে’র প্রবাহে ॥ সাদিয়া সুলতানা


এই সময়ে অনেকেই লিখছেন, কিন্তু সবাই পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না বা পাঠকপ্রিয় হয়েও উঠতে পারছেন না।পাঠক আর লেখকের মধ্যকার এই দূরত্ব ঘোচানোর বিষয়টি সব লেখক আমলে না নিলেও আমি বিশ্বাস করি লেখক বা বই নির্বাচনের ক্ষেত্রে পাঠকের হিসেব-নিকেশ একেবারে আলাদা হয়।আর যাই হোক পাঠক মাত্রই চান একজন লেখকের লেখা পাঠের মাধ্যমে তার সময়ের সদ্ব্যবহার হোক। সবসময় বিনোদন বা চমকদার কিছু খোঁজেন যারা তারা অবশ্য এর ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়েন।

লেখক শানজানা আলম এই সময়ের লেখক।তাকে অনায়াসে পাঠকপ্রিয় লেখকও বলা যায়।শানজানা আলমের লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ আর আকর্ষণ দেখে আমিও খানিকটা কৌতূহলী হয়ে তাকে পাঠ তালিকায় নিয়েছি।এত শত মানুষের নির্বাচন যে ভুল হবে না সেই বিষয়টি নিয়ে সংশয় না থাকলেও তার লেখা নিয়ে সামান্য দ্বিধা ছিল মনে সেই বিষয়টিও অস্বীকার করবো না।আসলে চোখ-কান খোলা রাখলেই যেখানে টের পাওয়া যায় পুঁজিবাদ সাহিত্যকে গিলে খেতে চাইছে সেখানে এমন দ্বিধা মনে আশা হয়তো আমার মতো পাঠকের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক কিছু নয়।

আমার পাঠ অভিজ্ঞতায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে ঔপন্যাসিক শানজানা আলমের উপন্যাস ‘জল মিশে যায় জলে।’ শানজানার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শব্দ আর বাক্যের জলের সরলতা।ছোট ছোট সরল বাক্যে জীবনের বড় পরিসরকে এই লেখক বাঁধতে জানেন।তাই বলে ঘটনাপ্রবাহ মোটেই লঘু হয় না তার লেখায়।বরং অনেকটা যত্ন নিয়ে তিনি গল্প বা উপন্যাসের এক একটি চরিত্র নির্মাণ করেন।

‘জল মিশে যায় জলে’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মিনুকে লেখক নির্মাণ করেছেন এমনই যত্ন নিয়ে।মিনু একটি মাধ্যমিক স্কুলের অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করে।মিনুর জীবনের কিছুই সমান বা সমান্তরাল নয়, মিনুর ভাষায়, ‘বাঁকা, বক্র, হিজিবিজি।’ মিনুকে ঘিরে ব্যবসায়ী ইমতিয়াজ আহমেদ, তার মেয়ে প্রিয়সী, স্ত্রী রিমা-এই চরিত্রগুলো এলেও খুব দ্রুত পাঠক এই দম্পতির জীবনের ফ্রেমেও ঢুকে পড়ে।লেখক ইমতিয়াজ-রিমার মধ্যকার দূরত্ব, টানাপোড়েন ইত্যাদি নিয়ে পাঠককে বেশ গোলকধাঁধার ভেতরেও ফেলে দেন।যদিও মানবিক সম্পর্কের ওঠানামা নির্মাণ করতে গিয়ে অনেকক্ষেত্রে চরিত্রের দর্শনকেই লেখকের দর্শন বলে ভ্রম হচ্ছিল তবু বলবো এই সমাজে এমন ধরনের দ্বিমুখী সত্তার অধিকারী মানুষের অভাব নেই।

তাই এই উপন্যাসের ৪৯ পৃষ্ঠায় লেখক যখন রিমার হয়ে জীবনের কিছু পর্যবেক্ষণ আনছেন তখন পাঠকের ভ্রু সামান্য কুঁচকে উঠলেও তা অস্বীকার করার উপায় থাকছে না।যদিও মনে হয়েছে ‘সংসার ধরে রাখার জিনিস, সহ্য করেও ধরে রাখতে হয়।ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই, বাইরের পৃথিবী যে সাফল্যটা দেখতে পায়, তার বিপরীতে মনের মধ্যে তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়।এই শূন্যতা বাইরের কেউ দেখে না। অনুভব করে না।’-এই বক্তব্যটুকু রিমার মুখ দিয়ে সংলাপ আকারে বের হলেই যেন ভালো হতো।তাহলে হয়তো লেখক যে নির্মোহ দৃষ্টিতে চরিত্র আর ঘটনা নির্মাণ করছেন তা ধরে নেওয়া পাঠকের জন্য সহজ হতো।

এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক রমাপদ চৌধুরীর একটি উক্তি মনে পড়ছে, ‘…হঠাৎ ঔপন্যাসিক ছোটগল্প-লেখককে দেখতে পাবেন পথের ধারে, একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন উদাস দৃষ্টি মেলে। এ কোন উন্নাসিক লেখক?-মনে মনে ভাববেন ঔপন্যাসিক। কোনও মিনারের চূড়ায় উঠল না, দেখল না যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, শোভাযাত্রায় সঙ্গ নিল না, এ কেমনধারা সাহিত্যিক!’

আমি এভাবেই ভাবি, একজন ঔপন্যাসিক মিনারের চূড়ায় উঠে দেখবেন, যুদ্ধের ইতিবৃত্ত দেখবেন, শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন কিন্তু নিজে যুদ্ধে লিপ্ত হবেন না।

রিমার মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের উল্লিখিত অংশটুকু বাদ দিলে জল মিশে যায় জলে পড়তে পড়তে বুঝতে পারছিলাম কথাসাহিত্যিক শানজানাও দূর থেকে দেখছেন, কাছ থেকেও দেখছেন, দেখছেন নিবিড়ভাবে।এই দেখাদেখি জলের স্রোতের মতো বাক্যে বাক্যে প্রবহমান হচ্ছে যা পাঠককে স্বস্তি দিচ্ছে।

এই উপন্যাসে কয়েকটি অস্বস্তিকর চরিত্রও আছে।জল মিশে যায় জলে উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ইদ্রিস আলী তেমনই এক চরিত্র। সুবিধাবাদী, কুটকৌশলে পারদর্শী ইদ্রিস আলী মিনুর বাবা, গুলনেহারের স্বামী।গুলনেহার তার দ্বিতীয় স্ত্রী, যে নিজেও স্বামীর মতো কৌশলী, আচরণে রূঢ় এবং লোভী।ঔপন্যাসিক এই দুইটি চরিত্রের মনস্তত্ত্ব সুনিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।বিশেষ করে প্রথম পৃষ্ঠাজুড়ে ইদ্রিস আলীর সংসারের বর্ণনা এবং ইমতিয়াজ আহমেদের কাছে চাকরি চাইতে যাওয়া সময়ে তার যেই মনস্তত্ত্ব লেখক বর্ণনা করেছেন তা একেবারে নিখুঁত, নিখাদ মনে হয়েছে।একটা নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষগুলো যেভাবে যতটুকু আবেগ পুষে রাখে, প্রেষণা দ্বারা যেভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা নিবিড় চোখে দেখে কলমের আঁচড়ে তুলে এনেছেন লেখক।

ইদ্রিস আলীর প্রথম স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান মিনু, মুর্শিদা, জাহিদা, মানিক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তান রাব্বি-অল্প সময়ের মধ্যে লেখক এমন অসংখ্য চরিত্রের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিলেও পাঠককে খেই হারানোর সুযোগ দেননি।ছোট ছোট পর্বে এক একটি চরিত্র, তাকে ঘিরে বিভিন্ন পার্শ্ব-চরিত্র, তার জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ক্লাইমেক্সকে তিনি কৌশলের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন।

জল মিশে যায় জলে পড়তে পড়তে যখনই মনে প্রশ্ন এসেছে, এই আখ্যান কি শুধু আটপৌরে জীবনকে ঘিরেই আবর্তিত? ঠিক তখনই পাঠক আমার জন্য নতুন একটা চমক এসেছে আর ঘটনাপ্রবাহও ভিন্ন দিকে বাঁক নিয়েছে।

‘জল মিশে যায় জলে’ পড়তে পড়তে শেষের দিকে মনে হচ্ছিল খানিকটা অস্থিরতা কাজ করেছে লেখকের ভেতরে।শেষ কয়েক পর্বে তিনি একটু যেন অযত্নও করেছেন সম্পাদনায়।এই যেমন নেহারের প্রথম স্বামী কেন রাব্বিকে নিজের কাছে এনেছেন এই অংশটা বইয়ের ৭৩ ও ১৭৪ পৃষ্ঠায় দুবার এসেছে।আবার মুশু চরিত্রটা বিনু হয়ে গেছে কয়েক জায়গায়, সেই সঙ্গে বেশ কয়েকটি সরল বাক্যে উদ্ধরণ চিহ্ন বসেছে।এসব অপাংক্তেয় সীমাবদ্ধতা বাদ দিলে জল মিশে যায় জলের প্রবাহে অবগাহনের সময়কাল আমার জন্য বেশ আনন্দের ছিল।

উপন্যাস: জল মিশে যায় জলে
লেখক: শানজানা আলম
প্রকাশকাল: ২০২১
প্রকাশনী: অন্যপ্রকাশ