৬. শবে বরাতের বরাত
স্মৃতি জিনিসটাই বিচ্ছিরি; একবার যদি ভুল করেও এতে ডুব দেয় কেউ, উঠে এলেও রোমের গহ্বর চুঁইয়ে চুঁইয়ে স্মৃতিকণা ঝরতে থাকবে যা হাসাবে, কাঁদাবে, হৃদপিণ্ডে ক্ষরণ ঘটাবে।মুক্তি দেবে না সহজে।ঢেউ কেটে কেটে জলযান যেভাবে বিবিধ গতিতে এগিয়ে চলে ঠিক সেভাবেই এগিয়ে চলছে স্মৃতির রথ।রথে চড়ে একটু একটু করে পথ এগোচ্ছি আর নাছোড়বান্দা ইচ্ছে সব মাথা চাড়া দিচ্ছে।সবচেয়ে বেশি ঘায়েল করে যে ইচ্ছে তা হলো ‘শৈশবে-কৈশোরে ফেরার ইচ্ছে।’
এই ইচ্ছেপূরণ সম্ভব নয় বলেই স্মৃতির কাছে ফেরা।কত কী যে মনে পড়ছে তাই হুড়মুড়িয়ে।কোনটা রেখে কোনটা বলি,কোনটা আগে বলি; খেই হারাই বার বার।এই তো আজ ভাবছি আমাদের সময়ে শবে বরাত উদযাপনের কথা, হুড়মুড় করে মনে পড়ছে ফেলা আসা সময়ের রোজা, ইফতার, চান রাত, মেহেদি ভরা হাত, নতুন জামা, ঈদের দিনের থৈ থৈ আনন্দের কথা।জানি ওসব দিন আর আসবে না, শবে বরাতে বরাতের ফয়সালা হয়তো ঠিক ঠিক হতেই থাকবে।
ইসলামী দিনপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান মাসের মাসের ১৪ ও ১৫ তারিখের মধ্যবর্তী রাতে আসে পবিত্র ‘লাইলাতুল বরাত’ বা ‘শবে বরাত।’
ছোটবেলায় শুনতাম এই রাত পবিত্র রাত।বিশ্বাস করতাম, মহান আল্লাহ তার বান্দাদেরকে এই রাতে বিশেষভাবে ক্ষমা করেন আর এই রাতেই বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ করেন।এদিকে সারা বছর যেই বান্দার আমল করার খবর থাকতো না সেই বান্দাও শবে বরাতে নিজের ভাগ্য নতুন করে লেখানোর লোভে আমলে মনোযোগী হতো।
আমারও কি লোভ কম ছিল! মাগরিবের সময়ে গোসল করলে নাকি এত এত সওয়াব হয়, সেই সওয়াবের লোভে ঝটপট গোসল করে ফেলতাম। তারপর জায়নামাজ বিছিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে নামাজ পড়ার প্রতিযোগিতা শুরু হতো।আর সারাদিনের আয়োজন, ব্যস্ততার কথা তো না বললেই না।আগেরদিন থেকেই মায়ের ব্যস্ততার অন্ত থাকতো না। শুধু আমাদের বাড়িতে কেন বিশেষ দিনটিতে আশেপাশের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নানারকম হালুয়া, বরফি, চালের আটার রুটি বানানো হতো। যেই বাড়িতে কালেভদ্রে গরুর বা মুরগির মাংস রান্না হতো সেই বাড়ি থেকেও মাংস রান্নার ঘ্রাণ ভেসে আসতো, রুটির সঙ্গে একটু মাংসের ঝোল না হলে যেন কারও মন ভরতো না।
আমাদের বাড়িও এর ব্যতিক্রম ছিল না।বাবাহীন সংসারে আমাদের শখ পূরণের সাধ্যাতীত চেষ্টা ছিল মায়ের।হালুয়া তেলে উঠে যাওয়ার পর চুলা থেকে নামিয়ে ভাঁপটা সরে যেতে যতক্ষণ, এরপর মায়ের সঙ্গে হাত লাগিয়ে আমরা বোনেরা বোনেরা পোড়ামটির কালো রঙের নকশা আঁকা ছাঁচের ভেতরে চেপে গোল গোল হালুয়ায় নকশার ছাপ দিয়ে ফেলতাম। রুটি বেলার পিঁড়িতে গরম গরম হালুয়া ঢেলে নিয়ে কুসুম কুসুম ওমের মধ্যেই বরফি কাটা হতো।কাজের সময় আস্ত একটা হালুয়া কি হালুয়ার কোনা ভেঙেও মুখে দেওয়া বারণ ছিল।সব বানানো হলে তারপর যার যার ভাগ বুঝে নেওয়া চলতো।এরপর গাজর, সুজি, বুটের হালুয়া, রুটি ট্রেতে সাজিয়ে মাথায় একটা ওড়না পরে প্রতিবেশিদের বাড়িতে দিতে যেতাম।আমাদের প্লেট, বাটি খালি আসতো না কখনোই।এ বাড়ির খাবার ও বাড়ি, ও বাড়ির খাবার এ বাড়িতে ভাগাভাগি করতে করতে মনের ভেতরে আনন্দ বুদ বুদ করে উঠতো, এই তো সামনেই রোজা…দেখতে দেখতে ঈদ চলে এলো বলে!
এদিকে মসজিদের সামনে সাহায্যপ্রার্থীদের দীর্ঘ লাইন বসে যেতো। বাড়িতে বাড়িতেও কড়া নেড়ে চলতো ভিক্ষুকেরা, ‘আম্মা, এট্টু হালুয়া, রুটি দেন না।’
বিস্তর সওয়াব হাসিলের লক্ষ্যে এদের খালি হাতে ফেরানো যাবে না বলে আমাদের বিস্তর ছুটোছুটি শুরু হতো।আর যেই দুষ্টু বালকের দলকে সারা বছরেও মসজিদের ত্রি-সীমানায় দেখা যেতো না আলমারিতে তুলে রাখা পাঞ্জাবি-পায়জামা নামিয়ে পরিপাটি হয়ে তারাও নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদের দিকে ছুটতো।এই ছুটোছুটির ফাঁকে আতশবাজি আর পটকার কথা ভুলতো না তারা।হৃদকাঁপানো আওয়াজে পাড়া কেঁপে উঠলে এদের আনন্দের সীমা থাকতো না।আমরা যারা বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেতাম না তারা বাড়ির ছাদ অথবা বারান্দা থেকে আকাশ পানে ধেয়ে চলা আলোর ঝালর দেখতাম।
সবকিছু কেন অতীতকালেই লিখছি? এখনো তো শবে বরাত আসে। ইবাদতে মগ্ন হয় মানুষ। তবু কেন আজ অতীত সব?
সত্যি সবই হয় আগের মতো তবু কী যেন একটা নেই এখন, কিছু একটা নেই। এই যে চারদিকে কেমন দিনবদলের সুর। শবে বরাতের দিনে এই হালুয়া-রুটি তৈরি, এসবের বিলিবণ্টন বেদাত বলে অনেক বছরই হলো অভিমত জানাচ্ছেন অনেকে।পোড় খাওয়া হৃদয়ে উপলব্ধি করি ধর্মরক্ষার নামে বহুবিধ স্ট্যাটাস দিতে যতোটা ব্যস্ত থাকছেন তারা, আমল নিয়ে যেন ততোটা নয়।
আসলে ‘ধর্ম গেল’ ‘সব গেল’ বলে কিছু মানুষ রব তোলেন বরাবরই তবু এক শ্রেণির মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঠিকই হালুয়া, রুটি বানিয়ে ভালোবাসার বিলিবণ্টন করে আজও সামাজিক সম্প্রীতিকে ধরে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে চলে।
পরের পর্ব পড়ুন : ঐ ঈদটা গেল কই!