১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে শিপ্রা ঘোষালের সঙ্গে দেখা হয়েছিল এই বাড়িটির সামনে। তখন তার যা বয়স আমারও তাই—-২৪। চকবাজারের তেলিকোণা থেকে ফিরছিলাম দুপুরের পর। চৈত্র্যের খাড়া রোদ মাথার ওপর। শুষ্ক ঝরঝরে বাতাস।
ছেলেবেলা থেকেই গান গাওয়ার অভ্যেস আমার। গুনগুন করে গান গাই প্রায় সারাক্ষণই। সেদিনও প্রিয় একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘সেই ভালো সেই ভালো / আমারে না হয় না জানো…..’ গেয়ে নির্জন রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। দেখলাম একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই বাড়িটির সামনে। গোলগাল ফর্সা মুখ ও বেশ দীর্ঘ শরীর। কালো শাড়িপরা। কুঁকড়ানো কালো চুল বাতাসে উড়ছে। খালি পা। টুনটুনি পাখির মতো চঞ্চল দুটি চোখ। তাকে দেখেই আমি চুপ করে গেলাম। কখনো এই মেয়েটিকে এই শহরে দেখেছি বলে স্মরণে এলো না। কে সে? কেনইবা এই বাড়িটির সামনে এই অসময়ে দাঁড়িয়ে আছে? ভূতপ্রেত নয়, কারণ তার ছায়া সুস্পষ্টভাবেই মাটিতে পড়েছে। তথাপি অবাক হয়ে তাকালাম এবং দুজনেই হাসলাম। তারপর তাকে পেছনে রেখেই আমি সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম আর পেছনে ফিরে তাকালাম না।
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে ভোরবেলা শান্তি মিছিল ছিল আমাদের। সারা শহর প্রদক্ষিণ করে চকবাজার থেকে যখন ফিরছিলাম দেখলাম ডিগম্বরী তলার গলির মুখে সে দাঁড়িয়ে! সেই কালো শাড়ি! খালি পা। হাতে ফুলের তোড়া। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে এগিয়ে এলো এবং গম্ভীর মুখে আমার ডান পাশে এসে পা পা মিলিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
রাজগঞ্জ বাজারের চৌরাস্তার মোড়ে এসে সে আলাদা হয়ে বজ্রপুরের গলির মুখে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি একটু অবাক হয়ে সামান্য এগিয়ে ফিরে এসে তার পাশে দাঁড়ালাম। বললাম, থেমে পড়লেন যে! আমরা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে গিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেব। ইচ্ছে করলে আসতে পারেন।
আমার কথা শুনে চঞ্চল দুটি চোখ আমাকে কয়েক মুহূর্ত দেখলো। কী দেখলো কে জানে! তখন বুঝতে পারলাম মেয়েটির চোখ ঈষৎ ট্যাঁরা। বাহ! ট্যাঁরা মেয়েদের সৌন্দর্যই আলাদা। আস্তে করে বললো, আমার পথ যে এখানেই শেষ! এখানেই তাকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবো বলে এসেছি।
তার হেঁয়ালি কথার কিছুই মাথার মধ্যে ঢুকলো না আমার। বললাম, কার কথা বলছেন? তিনি কে? এখানে কি আসবেন তিনি? তার জন্য প্রতীক্ষা করছেন?
আমার এতগুলো প্রশ্ন শুনে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, না। কেউ আসবে না। কারো আসার প্রতীক্ষাও আমার শেষ হয়েছে ১৯৭১ সালেই।
রোদটা ক্রমশ তেজি হয়ে উঠছে। বাতাসও তপ্ত। গ্রীষ্মের আগাম আভাস। পায়ের তলাটায় গরম অনুভূত হচ্ছে। গলাটাও শুকিয়ে আসছে। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললাম, ঠিক আছে। আসি তাহলে। ও! আমার নাম প্রবীর। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, ইতিহাসে অনার্স। থাকি ধর্মসাগর পশ্চিম পাড়ে। হয়তো আবার দেখা হবে।
এই কথা বলেই দু-তিন কদম হেঁটে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে ডাক এলো: শুনুন। একটু দাঁড়ান আমিও যাবো।
আমি ঘুরে দাঁড়ালে দেখতে পেলাম সে ফুলের তোড়া কপালে ঠেকিয়ে মাথা নত করে বিড় বিড় করে কী যেন বলছে। অবাক হলাম বটে কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। তাকিয়েই রইলাম। উত্তর দিকে রাজগঞ্জ বাজারের দিকে মুখ তার। কাকে প্রণাম জানাচ্ছে! তার সবই অদ্ভুত মনে হলো আমার কাছে।
দীর্ঘ প্রণাম শেষে আমার পাশে এসে বললো, চলুন।
দেখলাম তার চোখ দুটি বেশ লাল এবং অশ্রুতে টলোমলো। কাঁদছে মেয়েটি! কিন্তু কেন?
সেই প্রশ্নের উত্তর সে দিয়েছিল সপ্তাহখানেক পরে চলে যাওয়ার আগে।
আমরা দেশওয়ালিপট্টি হয়ে হেঁটে হেঁটে রানীর দিঘির পূবপাড়ে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখলাম মিছিলটি এসে প্রবেশ করছে কলেজের ফটক দিয়ে। আমরাও গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলাম। তারপর এক-এক করে সবাই চলে গেল। রয়ে গেলাম আমরা দুজনে। বন্ধুরা ডাকলো আমাকে যাবো কিনা টাউন হলে অনুষ্ঠান আছে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে। বললাম, তোরা যা আমি আসছি।
তখন কলেজ গেটের কাছে রানীর দিঘির পশ্চিম-উত্তর কোণে কৃষ্ণচূড়ার গাছ ছিল। তার নিচে চায়ের স্টল ছিল একটা। আমি বললাম, বেশ গরম! গলাটা শুকিয়ে গেছে। একটু চা চলবে?
ঘাড় কাৎ করে সম্মতি দিল। চা পান করতে করতে বললাম, কিছু মনে করবেন না। আপনার পরিচয়টাই জানা হলো না। মনে হয় আপনি এই শহরের কেউ নন, তাই না?
বললো, ঠিকই ধরেছেন। আমি সিলেট থেকে এসেছি। এখানে আমার মামার বাড়ি ছিল নানুয়া দিঘির দক্ষিণ পাড়ে। আমার নাম শিপ্রা ঘোষাল। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ি। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত কুমিল্লায় ছিলাম আমি মামার কাছে। আমার বাবা-মা ছোটভাইকে নিয়ে লন্ডনে গিয়েছিল অসুস্থ জ্যাঠাকে দেখার জন্য। আমি যাইনি। ……..আর এবার এলাম এত বছর পর।
আমি বললাম, এত বছর পর মানে মামাকে দেখার জন্য?
—না। মামারা স্বাধীনতার পর আর কলকাতা থেকে ফেরেনি। রয়ে গেছে। আমি এসে উঠেছি আমার এক বান্ধবীর বাসায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রঞ্জিতা পাল।
—আচ্ছা। রাজগঞ্জ চৌরাস্তার মোড়ে কাকে প্রণাম জানালেন?
চুপ করে থাকলো শিপ্রা। চায়ের কাপটা ফিরিয়ে দিয়ে বললো, আমার এক বন্ধুকে।
আর কিছু বললো না সে। বললো, চায়ের দাম কত?
আমি বললাম, ছি ছি। আমি অফার করেছি। দাম দিয়ে লজ্জায় ফেলবেন না। বলে দামটা আমিই দিয়ে দিলাম। শিপ্রা ধন্যবাদ জানালো। তারপর দুজনে দুদিকে চলে গেলাম।
তিন-চার দিন পরের ঘটনা। সন্ধেবেলা টাউন হলে ছিল বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান। কারা আয়োজন করেছিল আজ আর মনে নেই। লোকে লোকারণ্য। হৈচৈ বাইরে এবং হলের ভেতরেও। আমি মাঝামাঝি জায়গায় দেয়ালের কাছে বসে আছি। সেদিন দুপুর থেকেই তুমুল বৃষ্টি। একটু শীত শীত অনুভূতি। হালকা চাদর গায়ে দিয়ে এসেছিলাম। হাতে রবীন্দ্রনাথের “শেষের কবিতা” বইটি।সেটা পড়ছিলাম। গান শুরু হতে আরও দেরি। হঠাৎ দেখলাম শিপ্রা এসে হাজির। একেবারে আমার পাশেই এসে বসলো। নরোম করে বললো, কেমন আছেন?
আমি বইটি বন্ধ করে নড়ে চড়ে বসলাম। বললাম, ভালো। আপনি ভালো তো?
মাথা নেড়ে সায় দিল। আমরা পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গান শুনলাম। হঠাৎ করে কারেন্ট চলে গেল। অমনি হৈচৈ চিৎকার শিস দিচ্ছিল লোকজন। সে এক হুলুস্থুল বিশ্রী কাণ্ড। বললাম, চলুন বাইরে যাওয়া যাক।
শিপ্রা বললো, চলুন। আমারও যেতে হবে। আগামীকাল ফিরে যাবো ঢাকায়।
আমি শুনে একটু আহত হলাম অকারণেই। বললাম, ও।
হলের বাইরে ভীড়। সেই ভীড় ঠেলে দুজনে বেরিয়ে এলাম। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশ বেশ পরিষ্কার। পুরো শহরটা অন্ধকারে ডুবে গেছে। তারা মিট মিট করে জ্বলছে আকাশে। তবে বাতাসটা বেশ হিম কিন্তু আরামদায়ক। বললাম, আজ আর কখন বিদ্যুৎ আসে ঠিক নেই। চলুন আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।
—আপনি কষ্ট করবেন। আমি একাই যেতে পারবো। অবশ্য আপনার আপত্তি না থাকলে চলুন।
আমরা পাশাপাশি হেঁটে জলকাদা মাড়িয়ে কলেজের পথ দিয়ে রানীর দিঘির পাড়ে এলে শিপ্রা বললো, আচ্ছা। সেদিন যে গানটা গাইছিলেন আবার গান না। খুব ভালো লাগছিল গানটা।
আমি একটু থমকে দাঁড়িয়ে রানীর দিঘির দিকে তাকালাম। সাদা সাদা ঢেউ বাতাসে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে। আমি গানটা শুরু করলাম: ‘সেই ভালো সেই ভালো / আমারে না হয় না জানো……..’। গান গেয়েই হাঁটছিলাম। কখন শিপ্রা আমার ডান হাতটি তার মুঠোর মধ্যে চেপে ধরলো। গানটি শেষ হলে শিপ্রা বললো, অপূর্ব কণ্ঠ আপনার। এত সুন্দর রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে পারেন! আপনার চর্চা করা উচিত। …….জানেন, সেও রবীন্দ্রসঙ্গীত খুব ভালোবাসতো।
কার কথা বলছে শিপ্রা?
কখন সেই রাজগঞ্জ বাজারের চৌরাস্তার মোড়ে এসে গেলাম। তখনও অন্ধকার। টিম টিম করে দোকানগুলোতে হারিকেন না হয় কুপি, মোমবাতি জ্বলছে। রিকশার বেলের ট্রিং ট্রিং শব্দ। মনটা কেমন বিষণ্ণ হয়ে গেল আমার। শিপ্রাও কেমন চুপ হয়ে গেছে।
মোড়ে এসে বললো, সেদিন জানতে চেয়েছিলেন আমি এখানে কাকে প্রণাম করেছি?
—কিন্তু বলেননি তো!
—ওই যে টিনের বাড়িটির সামনে আমাদের দেখা হয়েছিল কয়েক দিন আগে দুপুরবেলা। সেটা একটা হোস্টেল। আমার বন্ধু তিলক রায় সিলেট থেকে এসেছিল আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য ২৪ মার্চ তারিখে কিন্তু আমাকে পায়নি। না পেয়ে ওই হোস্টেলে ছিল। মামা ১৫ তারিখেই আমাদেরকে নিয়ে আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে যায়। ২৫ তারিখ রাতের বেলা পুলিশলাইন আক্রমণ করে পাকসেনা। তিলক ৩০ তারিখ ভোরবেলা গোমতী নদীর ওপার যাবে বলে বেরিয়েছিল হোস্টেল থেকে। রাজগঞ্জের এই মোড়ে আসতেই হঠাৎ করে তাকে দেখতে পায় টহলরত পাক আর্মি আর অমনি গুলি করে হত্যা করে…….!
সহসা আমার পা থেমে যায়। বুকের ভেতরে তীক্ষ্ণ কিছু একটা নড়ে ওঠে।
বলতে বলতে শিপ্রার গলা ধরে আসে। ছলোছল করে ওঠে আমার চোখও। একটু থেমে বললো, স্বাধীনতার পর তার এক বন্ধু শিবুদার কাছ থেকে এই ঘটনা জানতে পারি।
শিপ্রা আঁচলে মুখ ঢাকে। কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে তার শরীর। আমি তার কাঁধে হাত রেখে সমবেদনা প্রকাশ করলাম। তারপর হাত ধরে এগিয়ে দিয়ে এলাম ছাতিপট্টি পর্যন্ত। গলির মোড়ে এসে তার ঢাকার ঠিকানাটা বলেছিল। বলেছিল যাওয়ার জন্য। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী পর্যন্ত মনে আছে আর বাকীটা মনে নেই। মুছে গেছে সময়ের স্রোতে।
মাত্র দুদিনের পরিচয় বন্ধুত্ব হওয়ার মতোও যথেষ্ট সময় নয়। তবুও শিপ্রা ঘোষাল যেন বহু যুগের পরিচিত বন্ধু ছিল আমার! বহু বছর যেন আমরা একসঙ্গে পথ হেঁটেছি। শিপ্রার অন্তরমথিত বেদনার অংশীদারও যেন আমি। কিন্তু শিপ্রাকে তো আমার কথা বলা হলো না! আমার কি কিছু বলার ছিল?
আজও যখন রবীন্দ্রনাথের হৃদয় বিষণ্ণকরা “শেষের কবিতা” পড়ি শিপ্রার মুখ মনে পড়ে। কোথায় আছে? কেমন আছে জানি না। শুধু জানি:
“কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও
তারই রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন
চক্রে পিষ্ট আঁধারের
বক্ষফাটা তারার ক্রন্দন
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে
ফেলি তার জাল
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হতে বহু দূরে………………’।