কোরিয়ার প্রাচীন নাম চোওছেন।এই চোওছেনের একটি প্রদেশ শিলা’র সঙ্গে প্রাচীন ভারতের অযোধ্যা তথা উত্তর প্রদেশের কোনো এক রাজবংশের বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় খ্রিস্টাব্দের উষালগ্নে।
অযোধ্যার সেই রাজবংশের এক কন্যা চোওছেনে এসে শিলা’র রাজবংশের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক মাধ্যমে বসতি স্থাপন করেন।তার নাম Heo Hwang-ok যিনি দশের অথিক সন্তানের জননী।তার বংশধররা কালক্রমে কোরিয়ার তিনটি বিখ্যাত পদবি যথাক্রমে হেও, কিম এবং লি নামে পরিচিতি লাভ করে।এই তিন বংশের জনসংখ্যাই বেশি বলে জানা যায়।
২০০১ সালে রানী হেও ওয়াঙ-ওকএর একটি স্মারক স্থাপত্য নির্মাণ করা হয় কোরিয়ান সরকারের প্রচেষ্টায় অযোধ্যা শহরে।যদিওবা ভারতীয় কোনো ইতিহাস গ্রন্থে এই বিষয়ে কিছুই লিখিত নেই।
একজন বিখ্যাত কোরিয়ান বৌদ্ধ ভিক্ষু হিয়েচোও বা হুই চাও শিলা থেকে ভারতে যান পর্যটক হিসেবে ৭২৩ খ্রিস্টাব্দে।আধুনিককালে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ভারতের সঙ্গে ১৯৭৩ সালে।
১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জাপানে শেষবারের মতো আসেন এবং অবস্থান করেন টোকিওতে শিল্পপতি ড.ওওকুরা কুনিহিকের বাসভবনে প্রায় তিন সপ্তাহকাল।সেই সময় কোনো এক সভায় জাপান প্রবাসী কতিপয় কোরীয় উচ্চশিক্ষার্থী কবিগুরুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা তাঁকে কোরিয়াতে আমন্ত্রণ জানান।
কিন্তু কবিগুরু তখন অসুস্থ ও ক্লান্ত ছিলেন।তাদের আমন্ত্রণ সবিনয়ে প্রত্যাখান করেন।তার বিনিময়ে ছাত্রদের অনুরোধে একটি চার লাইনের কবিতা লিখে উপহার দেন।কবিতাটির নাম দি ল্যাম্প অব দি ইস্ট।
সেটাই কোরিয়ার হাঙ্গুল ভাষায় অনূদিত হয়ে দোঙ ইল-বোও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এবং ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।কালক্রমে কবিতাটি কোরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে যায়।আজও কবিতাটি কোরিয়ান শিশুদের পাঠ্য বলে জানা যায়।
রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার অর্জন চীন, জাপানের মতো কোরিয়াতেও প্রবল ঝড় তুলেছিল বুদ্ধিজীবী মহলে।১৯১৫ সালেই গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা কোরিয়ান ভাষায় অনুবাদ হয়।সেইধারা অব্যাহত থাকার ফলে টেগোর সোসাইটি অব কোরিয়া গঠন করা হয় ১৯৮১ সালে, জাপানের দশ বছর পর।
প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট স্বনামধন্য কবি ও রবীন্দ্রঅনুবাদক শ্রীমতী কিম ইয়াং-শিক (১৯৩১-)। বিগত বছরগুলোতে ৭ খণ্ডে রবীন্দ্ররচনাবলী অনূদিত হয়েছে কোরিয়ান ভাষায় টেগোর সোসাইটির উদ্যোগে। বিস্তারিত আছে আমার গ্রন্থ ‘রবীন্দ্রনাথ ও জাপান: শতবর্ষের সম্পর্ক’তে।
সম্প্রতি কোরিয়ার প্রভাবশালী দৈনিক দোঙ ইল-বোও পত্রিকার ২২শে মার্চ , ২০১৯ তারিখের সংখ্যায় একটি চমকপ্রদ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।কলকাতার রবীন্দ্র জাদুঘরে কোরিয়া-কক্ষ হিসেবে একটি স্মারক সংগ্রহশালার উদ্বোধন করা হবে এই বছরের শেষ নাগাদ।(রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কি না উল্লেখ করেনি পত্রিকাটি।) রবীন্দ্র-কোরিয়া সম্পর্কিত তো বটেই, ভারত-কোরিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্কিত তথ্য ও দলিলপত্রাদিও এখানে সংরক্ষণ করা হবে।খুলে যাবে রবীন্দ্রজগতের আরও একটি দিগন্ত।
উল্লেখ্য যে, ২০১১ সালের মে মাসে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশত জন্মবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলের চোননোগু হেফাদোন সাবওয়ে স্টেশনের সম্মুখভাগে রবীন্দ্রনাথের একটি আবক্ষ স্মারক ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।
ছবি ও তথ্য : দৈনিক দোঙ ইল-বোও পত্রিকার সৌজন্যে