পর্ব-৫ ॥ পাঁচ দিন পর
নঈম-ঈদ তো চলে আসলো।ঈদ আসার কয়েকদিন আগে থেকেই বাড়ি ফেরা মানুষগুলো ফিরে যায় তার শিকড়ের কাছে, ভালোবাসার মানুষদের কাছে।কখনো দৃশ্যমান কখনো বা অদৃশ্য মমতার টানে। নীরব ঘরখানি, শূন্য উঠোনখানি তখন কোলাহলে মেতে ওঠে।কোথায় ঈদ করবি তুই?
নীলা-ঈদ নিয়ে তেমন কোনো উচ্ছ্বাস নেই।ঈদ আসলেই কি, না আসলেই কি।আমি বাবা-মার স্নেহের ছায়ায় ছিলাম নির্ভার।মনে হতো, বাবা-মায়ের ভালোবাসার আলোয় আমার জীবনে কোনো অন্ধকার আসবে না।বাবা-মা কেউ নেই।আমার চারপাশে সব আছে, কিন্তু এক অপার শূন্যতা যেন আমায় ঘিরে রাখে সারাক্ষণ।ঈদের সেই আনন্দ নেই।তর কি অবস্থা?
নঈম-এই তো কেটে যাচ্ছে। ঈদের পর গ্রামে যেতে পারি। কুশিগাঙ নদী পরিদর্শনে।
নীলা-ওখানে কেন?নদীর নামটা এমন কেন?
নঈম-তুমি তো জানো, নদী নিয়ে গবেষণা করি আমি। সেদিন খবরের কাগজে দেখলাম, সিলেটের সুরমা নদীর অন্যতম উপশাখা কুশি নদী। কুইগাঙ বা কুশিগাঙ নামে নদীটি বেশি পরিচিত।সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর এলাকার হাওর থেকে প্রবাহিত পাবিজুড়ি, কাফনা ও করিস নদীর সমন্বিত অংশ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ‘কুশি নদী’। বিভিন্ন হাওর-বিল হয়ে ৩৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটি মিলিত হয়েছে সিলেট নগরের সুরমা নদীর কুশিঘাট এলাকায়।সিলেটের সুরমা নদীর সঙ্গে জৈন্তাপুরের সারি নদীর একমাত্র সংযোগ নদী কুশিগাঙ। মোগল আমলে উত্তর-পূর্ব সিলেটের পাহাড়ি জনপদে চলাচল ও বাণিজ্যের একমাত্র যোগাযোগমাধ্যম ছিল কুশিগাঙের নদীপথ। স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নদীটি আশপাশের অঞ্চলে পানিপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে পানির চাহিদা পূরণ করে এলেও এখন নিজেই ধুঁকে ধুঁকে মরছে নদীটি।হারিয়েছে গতিপথ, ভরাট হয়ে যাচ্ছে নদীর বিভিন্ন স্থান।বর্ষাকালে পানিতে টইটম্বুর থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে নদীটি যেন মৃত খাল।এ সময়ে নদীর দুই পাশে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই সবজি চাষ করেন।নদীর বুকে পড়ে থাকে মাছ ধরার নৌকা।খননের উদ্যোগ নিলে প্রাণ ফিরে পাবে নদীটি। এজন্য যাব সেখানে। নদীটির প্রাণ ফেরার উদ্যোগ নেব।
নীলা-গুড, গুড, গুড।
নঈম-যাবি আমার সাথে সিলেটে?
নীলা-ঈদের পর হলে যাওয়া যায়।দেখি ছুটি যদি কয়েকদিন বেশি নিতে পারি, জানাব তকে।
নঈম-আরে চল, নদীর কাছে গেলে মন ভালো হয়ে যাবে।নদীর পানি, নদীর পাড়, নদীর পাড়ে বালু, কাদায় হাঁটলে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা হবে।নদীর পাশে বিস্তীর্ণ সোনালি ফসলের মাঠ, সঙ্গে নীলাভ আকাশ।ফসলি জমির পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী, কলকল ধ্বনিতে পানি প্রবাহিত হয়।এসব দৃশ্য দেখে যেন নদীর কাছে মায়া হয়।তর মন এমনিতেই সতেজ হয়ে যাবে। আমার বাড়িটা যদি নদীর কাছে হতো।
নীলা-ছোটবেলায় আমি একবার যমুনার পাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম।রবীন্দ্রনাথের কবিতা মনে করিয়ে দিলি,
“আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।
চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা,
একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা।”অসাধারণ একটি কবিতা।
নঈম-আমার একটা ফোন আসছে, ভালো থাক, কথা হবে। ঈদ শুভেচ্ছা।
কুশিগাঙ (পর্ব-৫) ॥ সাইফ বরকতুল্লাহ

অলঙ্করণ: লংরিড